Charyapada


চর্যাচর্যবিনিশ্চয়




পদমালা


১। রাগ পটমঞ্জরী | লূইপাদানাম্ |

২। রাগ গবড়া | কুক্কুরীপাদানাম্ |

৩। রাগ গবড়া  |  বিরুবাপাদানাম্ |

৪। জরাগ অরু | গুন্ডরীপাদানাম্ |

৫। রাগ গুঞ্জরী | চাটিল্লপাদানাম্ |

৬। রাগ পটমঞ্জরী | ভুসুকুপাদানাম্ |

৭। রাগ পটমঞ্জরী | কাহ্নপাদানাম্ |

৮। রাগ দেবক্রী | কম্বলাম্বর পাদানাম্ |

৯। রাগ পটমঞ্জরী | কাহ্নপাদানাম্ |

১০। রাগ দেশাখ | ( কাহ্নপাদানাম্ ) |

১১। সরাগ পটমঞ্জরী | কৃষ্ণাচার্যপাদানাম্ |

১২। রাগ ভৈরবী | কৃষ্ণপাদানাম্ |

১৩। রাগ কামোদ | কৃষ্ণাপাদানাম্ |

১৪। রাগ ধনসী | ডোম্বীপাদানাম্ |

১৫। রাগ রামক্রী | শান্তিপাদানাম্ |

১৬। রাগ ভৈরবী | মহীধরপাদানাম্ |

১৭। সরাগ পটমঞ্জরী | বীণাপাদানাম্ |

১৮। রাগ গউড়া | কৃষ্ণবজ্রপাদানাম্ |

১৯। রাগ ভৈরবী | কৃষ্ণপাদানাম্ |

২০। রাগ পটমঞ্জরী | কুক্কুরীপাদানাম্ |

২১। রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |

২২। রাগ গুঞ্জরী |  সরহপাদানাম্ |

২৩। রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |

২৪। -  ।

২৫। – ।

২৬। রাগ শীবরী | শান্তিপাদানাম্ |

২৭। রাগ কামোদ | ভুসুকুপাদানাম্ |

২৮। রাগ বল্লাড্ডি | শবরপাদানাম্ |

২৯। রাগ পটমঞ্জরী | লুইপাদানাম্ |

৩০। রাগ মল্লারী | ভুসুকুপাদানাম্ |

৩১। রাগ পটমঞ্জরী | আর্যদেবপাদানাম্ |

৩২। রাগ দেশাখ | সরহপাদানাম্ |

৩৩। রাগ পটমঞ্জরী | টেন্টণপাদানাম্ |

৩৪। রাগ শীবরী | শান্তিপাদানাম্ |

৩৫। রাগ মল্লারী | ভাদেপাদানাম্ |

৩৬। রাগ পটমঞ্জরী | কৃষ্ণাচার্যপাদানাম্ |

৩৭। রাগ কামোদ | তাড়কপাদানাম্ |

৩৮। রাগ ভৈরবী | সরহপাদানাম্ |

৩৯। রাগ মালশী | সরহপাদানাম্ |

৪০। রাগ মালসীগবুরা | কাহ্নপাদানাম্ |

৪১। রাগ কহ্নগুঞ্জরী | ভুসুকুপাদানাম্ |

৪২। রাগ কামোদ | কাহ্নপাদানাম্ |

৪৩। রাগ বঙ্গাল | ভূসুকুপাদানাম্ |

৪৪। রাগ মল্লারী | কঙ্কণপাদানাম্ |

৪৫। রাগ মল্লারী | কাহ্নপাদানাম্ |

৪৬। রাগ শবরী | জয়নন্দীপাদানাম্ |

৪৭। রাগ গুর্জরী | ধামপাদানাম্ |

৪৮। – ।

৪৯। রাগ মল্লারী | ভুসুকুপাদানাম্ |

৫০। রাগ রামক্রী | শবরপাদানাম্ |







কবি লূইপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | লূইপাদানাম্ |



কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল |

চঞ্চল চীএ পইঠো কাল || ধ্রু ||

দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ |

লূই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ || ধ্রু ||

সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই |

সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই || ধ্রু ||

এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস |

সুন্ন পাখ ভিড়ি লাহুরে পাস || ধ্রু ||

ভণই লূই আম্ হে ঝাণে দিঠা |

ধমণ চমণ বেণি পান্ডি বইঠা || ধ্রু ||



চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ

কায়া তরুবর, পাঁচই ডাল |

চঞ্চল চিত্তে প্রবিষ্ট কাল ১ ||

দৃঢ় করে মহাসুখ পরিমাণ কর |

লূই বলেন, গুরুকে পুছিয়া জান ||

সকল সমাধিত কেন করা হয় |

সুখ-দুঃখেতে নিশ্চিত মরতে হবে ||

এড়িয়ে এই ছন্দের বন্ধন (এবং) করণের (ইন্দ্রিয়ের ) পারিপাট্যের আশা |

শূন্য পাখায় ভর করে লও রে (তার) পাশ ||

লূই বলেন, আমি ধ্যানে দেখেছি |

ধমন--চমন২ দুই পিড়াতে বসেছি ||




১ . ধ্বংসকারী মহাকাল

২.শ্বাস--প্রশ্বাস




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

শরীরের গাছে পাঁচখানি ডাল–

চঞ্চল মনে ঢুকে পড়ে কাল।

দৃঢ় ক’রে মন মহাসুখ পাও,

কী-উপায়ে পাবে গুরুকে শুধাও।

যে সবসময় তপস্যা করে

দুঃখে ও সুখে সেও তো মরে।

ফেলে দাও পারিপাট্যের ভার,

পাখা ভর করো শূন্যতার–

লুই বলে, ক’রে অনেক ধ্যান

দেখেছি, লভেছি দিব্যজ্ঞান।








কবি কুক্কুরীপাদ

নরাগ গবড়া | কুক্কুরীপাদানাম্ |



দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই |

রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ || ধ্রু ||

আঙ্গণ ঘরপণ সুন ভো বিআতী  |

কানেট চৌরি নিল অধরাতী  ||ধ্রু ||

সুসুরা নিদ্ গেল বহুড়ী জাগঅ |

কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ || ধ্রু ||

দিবসই বহুড়ী কাউই ডরে ভাঅ  |

রাতি ভইলে কামরু জাঅ || ধ্রু ||

অইসন চর্যা কুক্কুরীপাএঁ গাইড় |

কোড়ি মঝেঁ একু হিঅহিঁ সমাইড় || ধ্রু||



চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ

দুলি১ দোহন করে পিটাতে২ ধরানো গেলনা |

বৃক্ষের তেতুল কুম্ভীরে খায় ||

অঙ্গন ঘরের পানে, শোনগো বিআতী৩ |

কর্ণাভরণ চোরে নিল অর্ধরাত্রিতে ||

শ্বশুর নিদ্রা গেল, বধূ জাগ্রত |

কর্ণাভরণ চোরে নিল, কার কাছে গিয়ে মাগছ ||

দিনে বধূ কাকের ভয়ে ভীত |

রাত্রি হলে কামরু৪ যায় ||

এইরূপ চর্যা কুক্কুরীপাদ কর্তৃক গীত হল |

কোটির মধ্যে একের চিত্তে প্রবেশ করল ||




১. স্ত্রী--কচ্ছপ

৩. বিবাহিত স্ত্রী (অবধূতী)

২. দুগ্ধ দোহন পাত্র

৪. কামরূপ (কামের রাজা)




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

কাছিম দুইয়ে উপচে পড়ে ভাঁড়,

গাছের তেঁতুল কুমিরের খাবার,

ভেদ নাই আর ঘরে-আঙিনাতে,

কানেট চোরে নিল অর্ধরাতে–

শ্বশুর ঘুমে, বধূ একা জাগে,

কানের কানেট কার কাছে সে মাগে?

দিনে বধূ কাকের ডরে কাঁপে,

রাতদুপুরে সে-ই ছোটে কামরূপে!

কুক্কুরীপার চর্যা এমনই যে

কোটির মাঝে একজন তা বোঝে।








কবি বিরুবাপাদ

রাগ গবড়া  |  বিরুবাপাদানাম্ |



এক সে শুন্ডিনী দুই ঘরে সান্ধঅ |

চীঅণ বাকলঅ বারুণি বান্ধঅ || ধ্রু||

সহজে থির করী বারুণি সান্ধে  |

জেঁ অজরামর হোই দিঢ় কান্ধে || ধ্রু||

দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইআ |

আইল গরাহক অপণে বহিআ  || ধ্রু||

চউশঠী ঘড়িয়ে দেট পসারা |

পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা || ধ্রু||

এক ঘ লী সরুই নাল  |

ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


এক সে শুন্ডিনী১  দুই ঘরে সাঁধাল ( প্রবেশ করল )

চিক্কণ বাকলের দ্বারা বারুণী বাঁধল২ ||

সহজে  (চিত্ত) স্থির করে বারুণী  পান করে |

যাতে অজরামর  (এবং ) দৃঢ়স্কন্ধ হয়  ||

দশমী দ্বারেতে চিহ্ন দেখে |

এল  গ্রাহক আপনি (পথ ) বেয়ে  ||

চৌষট্টি ঘড়ায় দেখাল পসার (সাজিয়ে ) |

প্রবেশ করল গ্রাহক , নিষ্ক্রমণ নাই ||

এক ঘ লী৩ সরুই  (তার ) নল  |

বলেন বিরুআ, স্থির করে চালো  ||




১. মদ্যবিক্রেতা স্ত্রীলোক

২. সূক্ষ্ম বল্কলের সাহায্যে মদ চোলাই করল

৩. ছোট  ঘড়া


চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

এক সে শুঁড়িনি, ঢোকে দুইখানি ঘরে,

চিকন বাকলে মদ্য ধারণ করে।

সহজে এ-মদ চোলাই করো রে, তবে

অজর অমর দৃঢ়স্কন্ধ হবে।

দশমীর দ্বারে ছদ্ম আমন্ত্রণ

দেখে, খদ্দের সেদিকে ধাবিত হ’ন–

পসরা সাজানো চৌষট্টি ঘড়ার,

খদ্দের ঢুকে বা’র হয় না রে আর।

একটাই ঘড়া, অতি-সরু মুখ তায়–

বিরু বলে, ঢালো ধীরে ধীরে ঘড়াটায়।








কবি গুন্ডরীপাদ

রাগ অরু | গুন্ডরীপাদানাম্ |



তিঅড্ডা চাপী জোইণি দে অঙ্কবালী |

কমল কুলিশ ঘান্টে করুহূঁ বিআলী || ধ্রু ||

জোইণি তঁই বিনু ঋণহিঁ ন জীবমি |

তো মুহ চুম্বী কমলরস পীবমি  || ধ্রু ||

খেপহূঁ জোইণি লেপন জায় |

মণিমূলে বহিআ ওড়িআণে সমাঅ || ধ্রু ||

সাসু ঘরেঁ ঘালি কোঞ্চা তাল্ |

চান্দ সুজ বেণি পখা ফাল্   ||ধ্রু||

ভণই  গুড্ডরী অম্হে কুন্দুরে বীরা |

নর অ নারী মঝেঁ উভিল চীরা  || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


তিঅড়া১ চেপে যোগিনী, দে আলিঙ্গন |

কমল-কুলিশ২ ঘেঁটে বিআলী৩  করি ||

যোগিনী তোকে বিনা ক্ষণকালও বাঁচবনা  |

তোর মুখচুম্বন করে কমলরস পান করব ||

খেপন থেকে যোগিনী, লেপন হল  |

মণিমূল বেয়ে উড্ডীয়ানে৪  প্রবেশ করল  ||

শাশুড়ীর ঘরে তালাচাবি লাগল |

চন্দ্র--সূর্য দুই পাখা বিস্ফারিত৫ (হল) ||

বলেন গুড্ডরী, আমি কুন্দুরে৬  বীর ||

নর--নারী মাঝে ওড়ানো হল চীর৭  ||




১ ত্রিবৃতক, স্ত্রীজননেন্দ্রিয়

২ যোনী--পুরুষাঙ্গ

৩ বৈকালিক খেলা (সুরতক্রিড়া )

৪ মহাসুখচক্র

৫ ফাল্ <স্ফার



৬ সুরতক্রিড়াতে

৭ বস্ত্র (নিশান ? )




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

জঘনের চাপে, যোগিনী, আলিঙ্গন দে!

দিন কেটে যাক পদ্ম-বজ্র-বন্ধে।

মুখ-ভরা তোর কমলের রস, চুমুর চুমুকে খাব।

একমুহূর্ত না যদি থাকিস তাহলেই ম’রে যাব।

খেপে গেছি আমি, যোগিনী আমার, মেয়ে,

ঊর্ধ্বলোকেই করেছি যাত্রা মণিমূল বেয়ে বেয়ে–

শাশুড়ির ঘরে তালাচাবি হ’ল আঁটা

চাঁদ-সূর্যের দু’পাখা পড়ল কাটা।

গুণ্ডরী বলে, আমি সুরতের হেতু

নর-নারী-মাঝে ওড়ালাম কামকেতু।








কবি চাটিল্লপাদ

রাগ গুঞ্জরী | চাটিল্লপাদানাম্ |



ভবণই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী  |

দুয়ান্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী || ধ্রু ||

ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই |

পারগামি লোঅ নিভর তরই || ধ্রু ||

ফাড্ডিঅ মোহতরু পাটি জোড়িঅ  |

আদঅ  দিঢ়ি টাঙ্গী  নিবাণে কোরিঅ  || ধ্রু||

সাঙ্কমত চড়িলে দাহিণ বাম মা হোহী  |

নিঅড্ডী বোহি দূর মা জাহী  || ধ্রু ||

জই তুম্ হে লোঅ হে হোইব পারগামী  |

পুচ্ছ তু চাটিল অনুত্তর সামী  ||ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


ভবনদী গহন গম্ভীর বেগে বাহিত |

দুপ্রান্তে কর্দম, মাঝে নেই ঠাই  ||

ধর্মার্থে  চাটিল সাঁকো গড়েন |

পারগামী লোক নির্ভয়ে তরে  ||

ফেরে মোহতরু, পাট জুড়ে  |

অদ্বয় দৃঢ় টাঙ্গীর (সাহায্যে ) নির্বাণকে (তৈরী ) করা হল  ||

সাঁকোতে ঠিকমত চড়লে , ডাইনে বামে হোয়ো না  |

নিকটে বোধি , দূরে যেওনা ||

যদি তোমরা লোকেরা পারগামী হবে |

জিজ্ঞাসা কর তুই (তুমি) অনুত্তর স্বামী চাটিলকে  ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ভবনদী বয় বেগে গহিন গভীর,

মাঝগাঙে ঠাঁই নাই, পঙ্কিল দু’তীর–

চাটিল ধর্মের জন্য সাঁকো গড়ে তায়,

পারগামী লোক তাতে পার হ’য়ে যায়।

অদ্বয়-কুঠারে চিরে মোহতরু, তার

তক্তা জুড়ে নির্বাণের সাঁকো হ’ল দাঁড়।

চেয়ো না ডাইনে বাঁয়ে এ-সাঁকোয় চ’ড়ে,

দূরে নয়, বোধি আছে নিকটেই ওরে।

কীভাবে ওপারে যাবে, যারা যেতে চাও,

অনুত্তর স্বামী গুরু চাটিলে শুধাও।









কবি ভুসুকুপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | ভুসুকুপাদানাম্ |



কাহৈরি ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস |

বেঢ়িল হাক পড়অ চৌদীস || ধ্রু ||

অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী  |

খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু অহেরী || ধ্রু ||

তিন ন ছুপই হরিণা পিবই ন পাণী |

হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী || ধ্রু ||

হরিণী বোলঅ হরিণা সুণ হরিআ তো |

এ বন ছাড়ী হোহু ভান্তো  || ধ্রু ||

তরংগতেঁ হরিণার খুর ন দীসঅ  |

ভুসুকু ভণই মূঢ়া হিঅহি ণ পইসঈ || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


কাকে গ্রহণ (বা) বর্জন করে কিভাবে আছি  |

বেষ্টিত হাক পড়ে চারদিকে১ ||

আপন মাংসে হরিণ বৈরী  |

ক্ষণকালও ছাড়েনা ভুসুকু শিকারী  ||

তৃণ না ছোঁয় হরিণ, পান করেনা পানি |

হরিণ হরিণীর নিবাস জানেনা ||

হরিণী বলে হরিণকে , শোনো হরিণ , তুমি |

এ বন ছেড়ে হয়ে যাও ভ্রান্ত  ||

তরঙ্গের জন্য হরিণের খুর দেখা যায়না |

ভুসুকু বলেন, (একথা) মূঢ়ের চিত্তে প্রবেশ করেনা ||




১  চতুর্দিক বেষ্টন করে শিকারীর লোকেরা হাঁক--ডাক করতে থাকে, যাতে হরিণ ভয়ে বন থেকে বেরিয়ে আসে | প্রথম দুই পংক্তি হরিণের উক্তি |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

কারে করি গ্রহণ আমি, কারেই ছেড়ে দেই?

হাঁক পড়েছে আমায় ঘিরে আমার চৌদিকেই।

হরিণ নিজের শত্রু হ’ল মাংস-হেতু তারই,

ক্ষণকালের জন্য তারে ছাড়ে না শিকারী।

দুঃখী হরিণ খায় না সে ঘাস, পান করে না পানি,

জানে না যে কোথায় আছে তার হরিণী রানি।

হরিণী কয়, হরিণ, আমার একটা কথা মান্ তো,

চিরদিনের জন্য এ-বন ছেড়ে যা তুই, ভ্রান্ত!

ছুটন্ত সেই হরিণের আর যায় না দেখা খুর–

ভুসুকুর এই তত্ত্ব মূঢ়ের বুঝতে অনেক দূর।








কবি কাহ্নপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | কাহ্নপাদানাম্ |



আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা |

তা দেখি কাহ্ন বিমন ভইলা || ধ্রু ||

কাহ্ন কহির গই করিব নিবাস |

জো মনগোঅর সো উআস  || ধ্রু ||

তে তিনি তে তিনি তিনি হো ভিন্না  |

ভণই কাহ্ন ভব পরিচ্ছিন্না  ||ধ্রু ||

জে জে আইলা তে তে গেলা  |

অবণাগবণে কাহ্ন বিমণ ভইলা || ধ্রু ||

হেরি সে কাহ্নি নিঅড়ি জিনউর বট্টই |

ভণই কাহ্ন মো হিঅহি ন পইসই ||ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


আলি--কালি১ দ্বারা পথ রুদ্ধ হল   |

তা দেখে কাহ্ন বিমনা হলেন ||

কাহ্ন কোথায় গিয়ে বাস করবেন |

যে মন--গোচর সে উদাস ||

তারা তিন, তারা তিন, ----তিনই ভিন্ন  |

কাহ্ন বলেন, ভব পরিচ্ছিন্ন২  ||

যে যে এল সে সে গেল  |

আসা--যাওয়াতে কাহ্ন বিমনা হলেন ||

দেখলেন কাহ্ন , নিকটে জিনপুর বর্তমান |

বলেন কাহ্ন , আমার চিত্তে প্রবেশ করেনা  ||




১ পারিভাষিক শব্দ : শ্বাস প্রশ্বাস

২ বিনষ্ট |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

আলিতে কালিতে পথ আটকায়,

তাই দেখে কানু বিমনাঃ, হায়!

কানু বলে, কই করব রে বাস?

যারা মন জানে তারা উদাস।

তিন জন তারা, তারা যে ভিন্ন,

কানু বলে, তারা ভবচ্ছিন্ন।

এই আসে তারা, এই হয় হাওয়া

বিমনাঃ কানু এ’ আসা ও যাওয়ায়।

নিকটেই জিনপুর: কীভাবে

মোহান্ধ কানু সেখানে পালাবে?








কবি কম্বলাম্বর পাদ

রাগ দেবক্রী | কম্বলাম্বর পাদানাম্ |



সোনে ভরিলী করুণা নাবী  |

রূপা থোই নাহিক ঠাবী  || ধ্রু ||

বাহ তু কামলি গঅণ  উবেসেঁ  |

গেলী জাম বহুড়ই কইসেঁ || ধ্রু ||

খুন্টি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছী  |

বাহ তু কামলি সদ্ গুরু পুচ্ছী  || ধ্রু||

মাঙ্গত চঢ়িলে চউদিসে চাহঅ |

কে আল নাহি কেঁ কি বাহবকে পারঅ || ধ্রু ||

বাম দাহিণ চাপী মিলি মিলি মাগা |

বাটত মিলিল মহাসুখ সঙ্গা  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


সোনায় ভরল করুণা নৌকা  |

রূপা রাখবার নাই ঠাঁই    ||

বেয়ে যা তুই কামলি, গগনের পানে  |

বিগত জন্ম ফিরবে কিভাবে  ||

খোঁটা উপ্ ড়ে , কাছি মেলে দিলি১ |

বেয়ে যা তুই কামলি, সদ্ গুরুকে পুছে  ||

মার্গে চড়লে চতুর্দিকে তাকানো যায় |

দাঁড় না থাকলে কেউ কি বাইতে পারে  ||

বামে দক্ষিণে চেপে পথ মিলিয়ে মিলিয়ে |

পথে মিলল মহাসুখের সঙ্গ  ||




১ নোঙর তুলে দিয়ে




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

করুণা-নৌকা পূর্ণ সোনায়,

রুপা রাখবার জায়গা কোথায়?

যাও রে, কামলি, আকাশের দেশে–

জন্ম গেলে কি আর ফিরবে সে?

খুঁটি উপড়িয়ে, কাছি খুলে শেষে,

বাও রে, কামলি, গুরু-উপদেশে।

গলুইতে চ’ড়ে চৌদিকে চাও,

হাল তো নাই, কে বাইবে এ-নাও?

বাঁয়ে আর ডানে চেপে চেপে গেলে

ঠিক পথ পেয়ে মহাসুখ মেলে।








কবি কাহ্নপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | কাহ্নপাদানাম্ |



নগর বাহিরেরেঁ ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ |

ছোই ছোই জাই সো বাহ্ম নাড়িআ || ধ্রু ||

আলো ডোম্বী তোএ সম করিবে ম সাঙ্গ |

নিঘিণ কাহ্ন কাপালি জোই লাঙ্গ || ধ্রু||

এক সো পদমা চৌসঠ্ ঠি পাখুড়ী |

তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী  || ধ্রু ||

হালো ডোম্বী তো পুছমি সদ্ ভাবে |

অইসসি জাসি ডোম্বী কাহরি নাবেঁ || ধ্রু ||

তান্তি বিকণঅ ডোম্বী অবরণা চঙ্গতা |

তোহোর অন্তরে ছাড়ি নড়পেড়া  || ধ্রু||

তুলো ডোম্বী হাউঁ কপালী  |

তোহোর অন্তরে মোএ ঘলিলি হাড়েরি মালী ||ধ্রু||

সরবর ভাঞ্জীঅ ডোম্বী খাঅ মোলাণ|

মারমি ডোম্বী লেমি পরাণ || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


নগরের বাইরে রে ডোম্বী তোর কুড়েঘর |

ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় তাকে ব্রহ্মণ (এবং) নেড়ে১ ||

ওলো ডোম্বী, তোর সাথে করব আমি সঙ্গ |

(আমি) নির্ঘৃণ কাহ্ন কাপালিক যোগী উলঙ্গ ||

এক সে পদ্ম চৌষট্টি পাপ্ ড়ি |

তাতে চড়ে , নাচে ডোম্বী বেচারী ||

ওলো ডোম্বী, তোকে পুছি সদ্ ভাবে |

আসিস্ যাস্ ডোম্বী, কার নায়ে  ||

তন্ত্রী বিক্রয় করিস্ ডোম্বী , বর্ণহীন চাঙ্গাড়ি |

তোর জন্যে ছেড়েছি নটপেটিকা  ||

তুই লো ডোম্বী , আমি কাপালিক |

তোর জন্যে আমি পরলাম হাড়ের মালিকা ||

সরোবর ভেঙে ডোম্বী খায় মৃণাল  |

মারব ডোম্বীকে , নেব প্রাণ ||




১ মুন্ডিতমস্তক শ্রমণ বা পন্ডিত |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

উপ্‌ড়ে কালের শক্ত খুঁটি

বিবিধ ব্যাপক বাঁধন টুটে

সহজ-নলিনীকুঞ্জে ঢুকে

মাতাল কানাই তৃপ্ত, সুখে।

হাতির যে-প্রেম হাতিনির তরে

তথতা সে-মদ বর্ষণ করে,

ষড়্গতি স্বস্বভাবে শুদ্ধ,

ভাবাভাবে কিছু নয় বিরুদ্ধ–

দশ দিকে রেখে দশ রতন

বিদ্যা-করীকে করি দমন।








কবি কাহ্নপাদ

রাগ দেশাখ | ( কাহ্নপাদানাম্ ) |



এ বংকার দৃঢ় বাখোড় মোড্ডিউ  |

বিবিহ বিআপক বান্ধণ তোড়িউ || ধ্র ||

কাহ্ন বিলসঅ আসব মাতা |

সহজ নলিনীবণ পইসি নিবিতা || ধ্রু ||

জিম জিম করিণা করিণিরেঁ রিসঅ

তিম তিম তথতা  মঅগল বরিসঅ || ধ্রু ||

ছড়গই সঅল সহাবে সূধ |

ভাবাভাব বলাগ  ছুধ || ধ্রু ||

দশবল রঅণ হরিঅ দশদিসেঁ  |

বিদ্যাকরি দমঙ্কু অকিলেসেঁ  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


এ-কার  বং--কার১ দৃঢ় দুই খোঁটা মর্দিত করে |

বিবিধ ব্যাপক বন্ধন ছিন্ন করে ||

কাহ্ন বিলাস করে, আসবমত্ত |

সহজ নলিনীবনে প্রবেশকরে (সে) নিবৃত্ত ||

যেমন যেমন করী করিণীকে ইর্ষা (প্রেম ) করে |

তেমন তেমন তথতা-মদগল বর্ষণ করে ||

ষট্ গতিসকল স্বভাবে শুদ্ধ |

ভাবাভাব বালাগ্র ক্ষুব্ধ নয় ||

দশবলরত্ন আহৃত হল দশদিক থেকে |

বিদ্যাকরী দমিত হল অক্লেশে ||




১ এ--কার চন্দ্র , বং-কার সূর্য ; পারিভাষিক শব্দ




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

লো ডোমনি, তোর নগর-বাইরে ঘর,

নেড়া বামুন আমায় স্পর্শ কর্‌!

আ লো ডোমনি, তোরে আমি সাঙ্গা করব ঠিক,

জাত বাছে না কানু, সে যে নগ্ন কাপালিক।

একখানি সে পদ্ম, তাতে চৌষট্টিটা পাপড়ি,

তার উপরে ডোমনি নাচে, কী নৃত্য তার, বাপ রে!

ডোমনি, তোরে প্রশ্ন করি, সত্যি ক’রে বল্,

কার নায়ে তুই এপার-ওপার করিস চলাচল?

আমার কাছে বিক্রি করিস চাঙাড়ি আর তাঁত,

নটের পেটরা, তোর জন্যেই, দিই না তাতে হাত।

তোর জন্যেই, হ্যাঁ লো ডোমনি, তোর জন্যেই যে

এই কাপালিক হাড়ের মালা গলায় পরেছে।

পুকুর খুঁড়ে মৃণাল-সুধা করিস ডোমনি পান–

ডোমনি, তোরে মারব আমি, নেব রে তোর প্রাণ!








কবি কৃষ্ণাচার্যপাদ

সরাগ পটমঞ্জরী | কৃষ্ণাচার্যপাদানাম্ |



নাড়ি শক্তি দিঢ় ধরিঅ খট্টে |

অনহা ডমরু বাজএ বীরনাদে || ধ্রু ||

কাহন কাপালী যোগী পইঠ অচারে  |

দেহ নঅরী বিহারএ  একাকারে || ধ্রু ||

আলি কালি ঘন্টা নেউর চরণে |

রবি শশি কুন্ডল কিউ আভরণে || ধ্রু||

রাগ দেশ মোহ লাইঅ ছার |

পরম মোখ লব এ মুক্তিহার || ধ্রু ||

মারিঅ সাসু নণন্দ ঘরে সালী |

মাঅ মারিআ কাহ্ণ ভইঅ কবালী || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


নাড়িশক্তি দৃঢ় (করে) ধরা হল খাটে১ |

অনাহত ডমরু বাজে বীরনাদে ||

কাহ্ন কাপালিক যোগী প্রবিষ্ট আচারে |

দেহ নগরীতে একাকারে২ বিহার করে ||

আলি--কালি (হল) চরণে ঘন্টা--নূপুর |

রবি শশীকে করাহল কুন্ডল আভরণ ||

রাগ--দ্বেষ-মোহের ছাই লেপে |

পরম মোক্ষ লাভ করল এ মুক্তাহার ||

ঘরে শাশুড়ী৩ , ননদ ও শালীকে৪, মেরে |

মাকে৫ মেরে কাহ্ন হল কাপালিক ||




১ শূন্যতা--প্রভাস্বর

২ অদ্বৈত অবস্থায়

৩ সাসু =  শ্বাস

৪ নণন্দ--সালী = নন্দকারী বন্ধন

৫ মাঅ  = মায়া




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

দৃঢ়করে ধরা নাড়ির তরু

বাজে অনাহত বীর-ডমরু

কানু যোগাচার সাধন করে,

একাকার ঘোরে দেহ-নগরে।

আলি-কালি পায়ে নূপুর ক’রে

সূর্য-চাঁদের মাকড়ি প’রে

ষড়‌রিপু ক’রে ভস্মসার

পরে সে মোক্ষমুক্তাহার।

মেরে সে শাশুড়ি ননদ শালি

এবং মায়াকে, কানু কাপালিক।








কবি কৃষ্ণপাদ

রাগ ভৈরবী | কৃষ্ণপাদানাম্ |



করুণা পিহাড়ি খেলহুঁ নয় বল  |

সদ্ গুরু বোহেঁ জিতেল ভববল  || ধ্রু ||

ফীটউ দুআ মাদেসিরে ঠাকুর |

উআরি উএসঁ কাহ্ণ ণঅর জিনউর  || ধ্রু ||

পহিলেঁ তোড়িআ বড়িআ মরাদিইউ  |

গঅবরে তোলিয়া পাঞ্চজনা ঘোলিউ || ধ্রু ||

মাতিএঁ ঠাকুরক পরিণিবিত্তা  |

অবস করিআ ভববল জিতা  || ধ্রু ||

ভণই কাহ্ণ আহ্মে ভলি দান দেহুঁ  |

চউষঠ্ ঠি কোঠা গুণিআ লেহুঁ  ||ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


করুণা--পিড়িতে খেলি নয়বল১ |

সদগুরু বোধে জিতলাম ভববল  ||

বিনষ্ট করলাম দ্বৈত ( সত্ত্বা ), পরাজিত রে ঠাকুর২ |

উপকারিকের উপদেশ কাহ্ণের নিকটে জিনপুর ||

প্রথম তেড়ে বড়ে মেরে দিলাম |

গজবরকে তুলে পাঁচজনকে ঘায়েল করলাম ||

মন্ত্রীদ্বারা ঠাকুরকে প্রতিনিবৃত্ত করে |

অবশ করে ভববল জিতলাম  ||

বলেন কাহ্ণ, আমি ভাল দান দিয়েছি |

চৌষট্টি কোঠা গুনে নিয়েছি ||




১  দাবাখেলা

২  রাজা  |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

খেলতে ব’সে দাবা করুণা-পিঁড়ায়

জিতেছি ভববল গুরুর কৃপায়:

রাজাকে আটকাই দুইমুখা চালে,

সামনে জিনপুর তাই তো কপালে।

প্রথমে গজ চেলে বড়েগুলি, আর

পাঁচটি আরও ঘুঁটি খেয়ে ফেলি তার,

মন্ত্রী দিয়ে শেষে রাজাকেই খাই,

কিস্তিমাত ক’রে ভববল পাই–

ভালোই দান চালি, কানু বলে এই,

চৌষট্টিটা ছঁক গুনে গুনে নেই।








কবি কৃষ্ণাপাদ

রাগ কামোদ | কৃষ্ণাপাদানাম্ |



তিশরণ নাবী কিঅ অঠ কুমারী |

নিঅ দেহ করুণা শূন মেহেলী  ||ধ্রু ||

তারিত্তা ভবজলধি জিম করি মাঅ সুইণা |

মঝ বেণী তরঙ্গম মুনিআ  ||ধ্রু ||

পঞ্চ তথাগত কিঅ কেড়ুআল  |

বাহঅ কাঅ কাহ্ণিল মাআজাল || ধ্রু ||

গন্ধ--পরস--রস জইসো তইসো  |

নিংদ বিহুনেঁ সুইণা জইসো  || ধ্রু ||

চিঅ--কণ্ণহার সুণত মাঙ্গে  |

চলিল কাহ্ণ মহাসুহ সাঙ্গে || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


ত্রিশরণকে১ নৌকা করল অষ্টকুমারী২ |

নিজ দেহ (হল ) করুণা, শূন্য (হল ) মহিলা  ||

পার হল ভবজলধি, যেমন করে মায়াস্বপ্ন (পার হয় ) |

মাঝে দুই তরঙ্গ অনুভূত হল  ||

পঞ্চ তথাগতকে করা হল দাঁড় |

বেয়ে চল কাহ্ন কায়া--মায়াজাল  ||

গন্ধ--স্পর্শ-রস যেরূপ  সেরূপ  |

নিদ্রা--বিহীন  স্বপ্ন যেমন ||

চিত্ত-কর্ণধার শূন্যতা-মার্গে |

চলল কানু মহাসুখের সঙ্গ করতে ||




১ বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ অথবা কায়, বাক্ ও চিত্ত

২ বুদ্ধি, ঐশ্বর্যাদি অষ্ট সুখানুভূতি




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ত্রিশরণ-নায়ে, আট কামরায়

এ-দেহ ভাসিয়ে দেখি

আমারই আপন দেহে মিলে যায়

শূন্য-করুণা, এ কী!

স্বপ্ন ও মায়া জেনে এ-জীবন,

ভবনদী তরলাম,

মাঝগাঙে এক ঢেউয়ের মতন

অনুভব করলাম।

পাঁচ তথাগতে দাঁড় ক’রে দেহ-নায়ে

কানু পার্থিব মায়াজাল ত’রে যায়।

গন্ধ রস ও স্পর্শ থাকুক

নিদ্রাবিহীন স্বপ্নের মতো,

শূন্যে, মনেরে মাঝি ক’রে, সুখ–

সঙ্গমে কানু হ’ল নির্গত।








কবি ডোম্বীপাদ

রাগ ধনসী | ডোম্বীপাদানাম্ |



গঙ্গা জঊনা মাঝেঁরে বহই নাই  |

তহিঁ চুড়িলী মাতঙ্গি-পোইআ লীলে পার করেই ||ধ্রু||

বাহ তু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা |

সত্গুরু পাঅপএঁ জাইব পুনু জিণউরা  || ধ্রু ||

পাঞ্চ কে আল পড়ন্তেঁ মাঙ্গে পিটত কাচ্ছী বান্ধী   |

গঅণ- দুখোলেঁ সিংচহুঁ পানী ন পইসই সান্ধী || ধ্রু ||

চন্দ--সূজ্জ দুই চকা সিঠি-সংহার পুলিংদা  |

বাম-দাহিণ দুই মাগ ন চেবই বাহতু ছন্দা || ধ্রু ||

করড়ী ন লেই বোড়ী ন লেই সুচ্ছড়ে পার করেই  |

জো রথেচড়িলা বাহবা ণ জাই কুলেঁ কুল বুড়ই ||ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


গঙ্গা--যমুনার মাঝেরে বয়ে চলে নৌকা |

তাতে চড়লে মাতঙ্গী-পুত্রী লীলায় পার করে ||

বেয়ে চল্ তুই ডোম্বী, বেয়ে চল ওলো ডোম্বী, পথে বেলা হল |

সদ্ গুরু--পাদপ্রসাদে যাব পুনর্বার জিনপুর ||

পাঁচ দাঁড় পড়ছে মার্গে, পিঠে কাছী বাঁধা |

গগন-সেঁউতি দ্বারা সিঞ্চন কর পানী, (যেন) না প্রবেশ করে ফাঁক দিয়ে ||

চন্দ্র-সূর্য দুই চাকা, সৃষ্টি-সংহার মাস্তুল |

বাম-দক্ষিণ দুই মার্গে না তাকিয়ে, তুই (স্ব)চ্ছন্দেবেয়ে চল্  ||

কড়ি নেয়না, বুড়ি নেয়না, স্বেচ্ছায় পার করে |

যে রথে চড়ল, (অথচ) বাইতে না জানে, (সে) কূলে-কূলেই ডোবে ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

পারাপারের নৌকা চলে গঙ্গা-যমুনায়,

মাতঙ্গিনী, যোগীকে পার করে সে-খেয়ায়।

সাঁঝ ঘনাল, বাও রে, ডোমনি, জোরসে চালাও না’,

গুরুর কৃপায় জিনপুরে ফের রাখব আমার পা।

পাঁচটি বৈঠা পাছ-গলুইয়ে, পিঁড়ায় বাঁধা দড়ি,

আকাশ-সেঁউতি দিয়ে নৌকা সেচো পড়িমরি।

সূর্য-চাঁদের লাটাই-দু’টি গোটায় এবং খোলে,

ডাইনে বাঁয়ে পথ নাই রে, যাও বরাবর চ’লে!

পয়সাকড়ি নেয় না ডোমনি, স্বেচ্ছায় পার করে;

বাইতে যে-জন জানে না, সে ঘুরে ঘুরে মরে।








কবি শান্তিপাদ

রাগ রামক্রী | শান্তিপাদানাম্ |



সঅসন্বেঅণ সরুঅ বিআরেতেঁ অলক্ খ ন জাই  |

জে জে উজুবাটে গেলা অনাবাটা ভইলা সোই  ||ধ্রু ||

কুলেঁ কুল মা হোই রে মূঢ়া উজুবাট সংসারা |

বাল তিল একু বাঙ্ক ন ভূলহ রাজপথ কণ্ঢারা || ধ্রু ||

মাআ-মোহা সমুদা রে অন্ত ন বুঝসি থাহা  |

অগে নাব ন ভেলা দীসঅ ভান্তি ন পুছসি নাহা || ধ্রু ||

সুনা পান্তর উহ ন দিসই ভান্তি ন বাসসি জাংতে  |

এষা অঠ মহাসিদ্ধি  সিঝএ উজু বাট জাঅন্তে  || ধ্রু ||

বাম দাহিণ দো বাটা ছাড়ী সান্তি বুলথেউ সংকেলিউ  |

ঘাট না গুমা খড়তড়ি নো হোই আখি বুজিঅ বাট জাইউ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


স্বসংবেদন স্বরূপবিচারে অলক্ষ্য লক্ষ  করা যায় না |

যে যে সোজা পথে গেল অনাবর্ত হল সেই ||

কূলে কূলে (ভ্রাম্যমান ) হয়ো না রে মূঢ় , সোজা পথ সংসার |

বালক এক তিল বাঁক ভুল কোরোনা, রাজপথ কনকধারা ||

মায়া- মোহ সমুদ্র রে, না বুঝিস্ অন্ত, (না পাস্ ) থই  |

সামনে নৌকা বা ভেলা দেখা যায় না , ভ্রান্তি (বশে) না পুছিস্ নাথকে ||

শূন্য প্রান্তর , নিশানা দেখা যায় না, ভুল না করিস যেতে |

এখানে অষ্ট মহাসিদ্ধি সিদ্ধ হয়, ঋজু বাটে গেলে ||

বাম দক্ষিণ দুই বাট ছাড়ি , শান্তি ঘোরেন খেলাচ্ছলে |

ঘাট নয় গুপ্ত , খরতর হয়নি (প্রবাহ), আঁখি বুজে বাটে যেও ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

স্বয়ং-সংবেদন-স্বরূপ বিচারে

অলখ হয় না লক্ষণ;

সোজা পথে গেল যে-যে, আর হয় না রে

তাদের প্রত্যাবর্তন!

কূলে-কূলে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ো না, মূঢ়,

সোজা পথ এই সংসার–

ভুল পথে তিলার্ধ না যেন রে ঘুরো,

কানাত-মোড়ানো রাজ-দ্বার।

মোহের মায়ার এই মহাসিন্ধুর

না-বুঝিস কূল আর থৈ,

নাও নাই, ভেলা নাই, দেখ যত দূর,

নাথে না শুধাও, পাবে কই।

শূন্য এ পাথারের পরিসীমা নেই,

তথাপি রেখো না মনে দ্বিধা–

অষ্টসিদ্ধিলাভ হবে এখানেই

হামেশা চলিস যদি সিধা।

শান্তি বলেন, বৃথা মরিস না খুঁজে,

তাকাস নে বামে দক্ষিণে;

সোজা পথে অবিরত চল্ চোখ বুজে,

সহজিয়া পথ নে রে চিনে।








কবি মহীধরপাদ

রাগ ভৈরবী | মহীধরপাদানাম্ |



তিনিএঁ পাটে লাগেলিরে অণহ কসণ ঘণ গাজই |

তা সুনি মার ভয়ংকর রে সঅ মন্ডল সএল ভাজই || ধ্রু ||

মাতেল চীঅ গঅন্দা ধাবই  |

নিরন্তর গঅণন্ত তুসেঁ ঘোলই || ধ্রু ||

পাপ-পুণ্য বেণি তিড়িঅ সিকল মোড়িঅ খম্ভা ঠাণা |

গঅণ-টাকলী লাগি রে চিত্তা পইঠ ণিবাণা  || ধ্রু ||

মহারস পানে মাতেল রে তিহুঅণ সএল উএখী  |

পঞ্চ বিষঅরে নায়ক রে বিপখ কোবী ন দেখী  || ধ্রু ||

খররবি- কিরণ সংতাপে রে গঅণাঙ্গণ গই পইঠা  |

ভণন্তি মহিত্তা মই এথু বুড়ন্তে কিম্পি ন দিঠা  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


তিন পাটেতে লাগল রে, অনাহত কৃষ্ণ মেঘ গর্জন করে |

তা শুনি মার ভয়ঙ্কর রে, সব মন্ডলসহ ভাগে  ||

মত্ত হয়ে চিত্ত-গজেন্দ্র ধাবিত হয়  |

নিরন্তর গগনপ্রান্তে তৃষ্ণায় ঘুর্ণিত হয়  ||

পাপ-পুন্য দুই শিকল ছিঁড়ে, মর্দিত করে স্তম্ভস্থান |

গগন-চূড়া স্পর্শ করে চিত্ত প্রবেশ করে নির্বাণে ||

মহারস পানে মত্ত হল রে, ত্রিভুবন সকল উপেক্ষা করে |

পঞ্চ বিষয়ের নায়ক রে, বিপক্ষে কাউকে দেখিনা ||

খররবি-কিরণ-সন্তাপে রে, গগনাঙ্গানে গিয়ে প্রবেশ করল |

বলেন মহিত্তা , আমি এখানে ডুবেও কিছুই দেখিনি |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

তিনটি পাটে কৃষ্ণ হাতির অশান্ত বৃংহণ,

শুনে, বিষয়-সমেত ভীষণ ‘মার’-এর আন্দোলন;

মত্ত গজেশ ছুটে গিয়ে শেষটায়

গগন-প্রান্ত ঘুলিয়ে ফ্যালে তেষ্টায়;

পাপপুণ্যের শক্ত শিকলটি এ

ছিঁড়ে ফেলে, স্তম্ভটি উপড়িয়ে,

গগন-চূড়ায় নির্বাণে মন প্রবেশ করল গিয়ে।

মন মহারস-পানে মত্ত হয়,

তিনটি ভুবন উপেক্ষিত রয়,

পাঁচ বিষয়ের নায়কের যে শত্রু কেউ নয়!

খররবিকিরণে মন গগন-গাঙে সাঁতরায়–

ডুবলে কিছুই যায় না দেখা!–মহীধরে কাতরায়।








কবি বীণাপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | বীণাপাদানাম্ |



সুজ লাউ সসি লাগেলি তান্তী |

অণহা দান্ডী চাকি কিঅত অবধূতী ||ধ্রু||

বাজই অলো সহি হেরুঅ বীণা |

সুণতান্তি ধনি বিলসই রুণা || ধ্রু ||

আলিকালি বেণি সারি সুণেআ |

গঅবর সমরস সান্ধী গুণিআ || ধ্রু ||

জবে করহা করহকলে চিপিউ  |

বতিস তান্তি ধনি সএল ব্যাপিউ  || ধ্রু ||

নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী  |

বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


সূর্য লাউ১,  শশি লাগল তন্ত্রী (রূপে ) |

অনাহত দন্ড, চক্র করা হল অবধূতীকে ||

বাজে ওলো সখী, হেরুক২  বীণা |

শূন্যতন্ত্রী-ধ্বনি করুণ (সুরে ) বিলসিত হয়  ||

আলি-কালি দুই সা (এবং) রে (ধ্বনি) শুনে |

গজবরের সমরসসন্ধি৩  গণনা করে  ||

যখন করহ করহকলে৪  চাপা হল |

বত্রিশ তন্ত্রীধ্বনি সর্বদিক ব্যাপ্ত হল  ||

নাচছেন বাজিল৫ , গাইছেন দেবী৬ |

বুদ্ধ নাটক বিসম হয় ||





১ বীণাযন্ত্রের খোল

২ হেরুক হলেন বজ্রযানীদের প্রধান উপাস্য : এরই অন্য নাম বজ্রধর বা ভৈরব

৩ মৈত্রী ও করুণার সমতা

৪ করাঙ্গুলি বাদ্যযন্ত্রের তারে

৫ বজ্রধর : বুদ্ধনাটকের একজন নট

৬ নৈরাত্মা




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

সূর্য হ’ল লাউ আর তার হ’ল চন্দ্র,

অবধূতি চাকি হ’ল, অনাহত দণ্ড;

হেরুক-বীণাটি বেজে ওঠে, সখী ও লো,

করুণায় শূন্য-তন্ত্রী বিলসিত হ’ল–

আলি-কালি দুই সুর হ’ল তাতে বন্দি,

গজবর, সমরস বীণাটির সন্ধি।

করতলে করপার্শ্ব চাপ দিলে পরে

বত্রিশ তন্ত্রীতে সব পরিব্যাপ্ত করে–

বজ্রাচার্য নৃত্য করে, দেবী ধরে গান,

বুদ্ধনাটকের তবে হয় অবসান।








কবি কৃষ্ণবজ্রপাদ

রাগ গউড়া | কৃষ্ণবজ্রপাদানাম্ |



তিনি ভুঅণ মই বাহিঅ হেলেঁ  |

হাঁউ সুতেলি মহাসুহ লীলে  || ধ্রু ||

কইসণি হালো ডোম্বী তোহোরি ভাভরিআলী |

অন্তে কুলিণজণ মাঝেঁ কাবালী  || ধ্রু ||

তঁই লো ডোম্বী সঅল বিটলিউ  |

কাজ ণ কারণ সসহর টালিউ  || ধ্রু ||

কেহো কেহো তোহোরে বিরুআ বোলই  |

বিদুজণ লোঅ তোরেঁ কন্ঠ ন মেলঈ  || ধ্রু ||

কাহ্নে গাই  তু কামচন্ডালী  |

ডোংবিত আগলি নাহি ছিণালী  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


তিন ভুবন আমাদ্বারা বাহিত (হল ) হেলায় |

আমি শুলাম মহাসুখলীলায়  ||

কিরূপ, ওলো ডোম্বী, তোমার নাগরালি  |

অন্তে কুলীনজন, মধ্যে কাপালিক  ||

তুই লো ডোম্বী, সকল নষ্ট করলি  |

বিনা কার্য-কারণে শশধর টলাইলি  ||

কেহ কেহ তোরে বিরূপ বলে  |

বিদ্বজ্জন--লোক তোর কন্ঠ ছাড়েনা  ||

কাহ্ন গাইলেন , তুই কামচন্ডালী  |

ডোম্বীর বাড়া ছিণালী নেই  ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

পার ক’রে দেই তিনটি ভুবন অবহেলায়

সুপ্ত থেকে মহাসুখের মহালীলায়।

ডোমনি রে, তোর ভাবকালির পাই না কোনো ঠিক,

পিছনে তোর কুলীনজন, সঙ্গে কাপালিক!

বিচলিত করলি, ডোমনি, সবকিছুকেই,

চাঁদটিকে তোর টলিয়ে দেওয়ার কারণ তো নেই!

বিরূপা কয় কুলোকে যদিও তোরে,

জ্ঞানী জনে রাখে গলায় মালা ক’রে।

কানু বলে, কামাতুরা রে চণ্ডালী,

তিনভুবনে তুলনাহীন তোর ছিনালি!








ককবি কৃষ্ণপাদ

রাগ ভৈরবী | কৃষ্ণপাদানাম্ |



ভব নির্ব্বাণে পড়হ মাদলা  |

মণ-পবণ বেণি করন্ড-কশালা  ||ধ্রু |

জঅ জঅ দুংদুহি সাব্দ উছলিআঁ  |

কাহ্ন ডোম্বি বিবাহে চলিলা  ||ধ্রু ||

ডোম্বি বিবাহিআ অহারিউ জাম  |

জউতুকে কিঅ আণুতু ধাম  || ধ্রু ||

অহনিসি সুরঅ--পসংগে জাঅ  |

জোইণিজালে রঅণি পোহাঅ || ধ্রু ||

ডোম্বীএর সঙ্গে জো জোই রত্তো  |

খনহ ণ ছাড়অ সহজ উন্মত্তো  || ধ্রু ||





চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


ভব--নির্ব্বাণে পটহ (এবং ) মাদল১ |

মন--পবন যুগল করন্ড (এবং ) কশালা২ ||

জয়--জয় দুন্দুভি--শব্দ উচ্ছলিত করে |

কাহ্ন ডোম্বী--বিবাহে চলল  ||

ডোম্বী বিয়ে করে আহার করল জন্ম |

যৌতুক করল অনুত্তর ধাম  ||

অহর্নিশি সুরত-প্রসঙ্গে যায়  |

যোগিনী--জালে রাত্রি পোহায়   ||

ডোম্বীর সঙ্গে যে যোগী রত  |

ক্ষণকালও (সে) ছাড়ে না, সহজ-উন্মত্ত ||




১  পটহ ও মাদল চর্মবাদ্য বিশেষ

২ করন্ড ও কশালা সম্ভবতঃ কাড়া ও নাকাড়া




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ভব নির্বাণ, পটহ মাদল;

মন ও পবন, কাঁসি আর ঢোল;

দুন্দুভি বাজে জয়-জয়-রবে,

কানু-ডোমনির আজ বিয়ে হবে।

ডোমনিকে বিয়ে ক’রে জাত গেল,

শ্রেষ্ঠ ধর্ম যৌতুক পেল;

কাটে নিশিদিন সুরত-রঙ্গে,

রজনি পোহায় যোগিনী-সঙ্গে–

যে-যোগী মজেছে ডোমনির পাঁকে

প্রাণ গেলে তবু ছাড়ে না সে তাকে।








কবি কুক্কুরীপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | কুক্কুরীপাদানাম্ |



হাঁউ নিরাসী খমণ ভতারে |

মোহোর বিগোয়া কহণ ন জাই  || ধ্রু ||

ফেটলিউ গো মাএ অন্তউড়ি চাহি |

জা এথু চাহাম সো এথু নাহি || ধ্রু ||

পহিল বিআণ মোর বাসনপূড় |

নাড়ি বিআরন্তে সেব বায়ুড়া  || ধ্রু ||

জা ণ জৌবণ মোর ভইলেসি পূরা |

মূল নখলি বাপ সংঘারা  || ধ্রু ||

ভণথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা |

জো এথু বুঝএ সো এথু বীরা || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


আমি  নিরাশী, ক্ষপণক ভাতার  |

আমার বিশেষ মিলন-সুখ কহা যায়না  ||

প্রসব করলাম গো মাতা, আঁতুরঘর চাই |

যা এখানে চাইলাম তা এখানে নাই ||

প্রথম বিআন আমার বাসনাপুট১ |

নাড়ী বিচারের পর সেও বায়ুতে বিলীন ||

যখন নবযৌবন আমার হল পূর্ণ  |

মূল খুঁড়লাম , বাপকে সংহার করলাম ||২

বলেন কুক্কুরীপাদ, এ--ভব স্থির  |

যে এ-কথা বোঝে সে এখানে বীর  ||




১ আকাঙ্খার ধন |

২ সুনীতিকুমারের সম্পাদিত পাঠ ও অর্থ | মূল পুথিপাঠ পৃ ৬০  |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

হলাম নিরাশ, স্বামী ক্ষপণক, হায়,

আমার বেদনা ভাষায় কওয়া না যায়।

বিয়ালাম গো মা, আঁতুড়ের খোঁজ নাই,

নাই কোনোকিছু, এখানে যা-কিছু চাই।

প্রথম প্রসব আমার, বাসনাপুট,

নাড়িটা কাটতে-কাটতেই, হ’ল ঝুঁট!

পূর্ণ আমার হ’ল নবযৌবন,

ঘটল মায়ের বাপের উৎসাদন।

কুক্কুরী ভনে, এ-জগৎ চির-স্থির,

যে জানে এখানে, সে-ই শুধু হয় বীর।








কবি ভুসুকুপাদ

রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |



নিসিঅ অন্ধারী মুসা চটারা  |

অমিঅ ভখঅ মুসা করঅ আহারা  || ধ্রু ||

মার রে জোইআ মুসা পবণা  |

জেঁ ণ তুটঅ অবণা গবণা  || ধ্রু ||

ভব বিন্দারঅ মুসা খণঅ গাতী |

চঞ্চল মুসা কলিআঁ নাশক থাতী || ধ্রু ||

কাল মুষা উহ ণ বাণ  |

গঅণে উঠি চরঅ অমণ ধাণ || ধ্রু ||

তব সে মুষা উঞ্চল পাঞ্চল   |

সদ্ গুরু বোহে করিহ সো ণিচ্চল  || ধ্রু ||

জবেঁ মুষাএর অচার তুটঅ |

ভুসুকু ভণঅ তবেঁ বান্ধন ফিটঅ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


নিশি আঁধার, মুষার চারণা |

অমিয় ভক্ষণ করে মূষা, করে আহার  ||

মার রে যোগী, মুষা-পবনকে |

যেন টুটে যায় অবনাগমন ||

ভব বিদারণ করে মুষা , খোঁড়ে গর্ত |

চঞ্চল মুষিক জেনে (তার) নাশক  হও ||

কাল মুষা , অনুভূত হয়না বর্ণ |

গগনে উঠে চরে আমন ধান (--এর মাঠে) ||

তবু সে মুষা উঞ্চল- পাঞ্চল১ |

সদ্ গুরুর বুদ্ধিতে কোরো তাকে নিশ্চল ||

যখন মুষার আচার টুটবে  |

ভুসুকু বলেন, তবে বাঁধন কাটবে ||




১ অস্থির




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

গভীর নিশীথে এখানে ওখানে চ’রে

অমৃতভক্ষ মূষিক আহার করে–

বায়ুরূপী ঐ মূষিকেরে, যোগিবর,

আনাগোনা-রোধকল্পে, ঘায়েল কর্‌।

চপল মূষিক, মাটি খুঁড়ে থাকে গর্তে,

জেনে তার ঠাঁই, ধাও তাকে বধ করতে।

কৃষ্ণ মূষিক, আঁধারে সে অগোচর,

আনমনা ধ্যানে হ’য়ে যায় সে খেচর,

উড়াম-বা’রাম অস্থির সে-মূষিক

যতখন গুরু না-দেখান তাকে দিক্।

ভুসুকু ভনয়: বিচরণ শেষ হ’লে

সেই মূষিকের সব বন্ধন খোলে।








কবি সরহপাদ

রাগ গুঞ্জরী |  সরহপাদানাম্ |



অপণে রচি রচি ভব নির্বাণা  |

মিছেঁ লোঅ বন্ধাবএ অপণা  || ধ্রু ||

অম্ভে ন জানহূঁ অচিন্ত জোই  |

জাম-মরণ-ভব কইসণ হোই  || ধ্রু ||

জইসো জাম মরণ বি তইসো  |

জীবন্তে মঅলেঁ নাহি বিশেসো  || ধ্রু||

জা এথু জাম মরণে বি সঙ্কা  |

সো করউ রস-রসাণেরে কংখা || ধ্রু ||

জে সচরাচর তিঅস ভমন্তি |

তে অজরামর কিম্পি ন হোন্তি || ধ্রু ||

জামে কাম কি কামে জাম  |

সরহ ভণতি অচিন্ত সো ধাম || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


নিজে রচনা করে করে ভব-নির্বাণ |

মিছে লোক বাঁধে আপনাকে  ||

আমরা জানিনা অচিন্ত্যযোগীরা  |

জন্ম-মরণ-ভব কিভাবে হয়  ||

যেরূপ জন্ম, মরণও সেরূপ  |

জীবন্তে মৃতে বিশেষ নাই  ||

যার এখানে জন্ম মরণেরও শঙ্কা |

সে করুক রস-রসায়নের আকাঙ্খা  ||

যিনি সচরাচর ত্রিদশ১  ভ্রমণ করেন |

তিনি অজরামর কোনোরূপে হবেন না ||

জন্মে কর্ম না কর্মে জন্ম |

সরহ বলেন, অচিন্ত্য সেই ধাম ||




১ বাল্য-কৈশোর -যৌবন  অথবা জন্ম - মৃত্যু - স্থিতি




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

নিজ মনখানি বেঁধে ভবনির্বাণে

মিথ্যাই লোক ফেরে তার সন্ধানে–

অচিন্তনীয় কিছুই জানি না, মন,

কীরূপে জন্ম, কীরূপে হয় মরণ।

জীবনে-মরণে নাই কোনো বিচ্ছেদ,

জীবিতে ও মৃতে নাই রে কোনোই ভেদ।

জন্ম-মৃত্যু-ভয়ে ভরা যার বাসা

সে ক’রে মরুক রসরসায়ন আশা;

ত্রিদশে ভ্রমণ করে যে সচরাচর

কীভাবে কভু-বা হবে সে অজরামর?

কর্মে জন্ম, নাকি সে জন্মে কর্ম?

সরহ বলেন, বড়ই ঘোরালো ধর্ম!








কবি ভুসুকুপাদ

রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |



জই তুহ্মে ভুসুকু অহেই জাইবেঁ মারিহ সি পঞ্চজণা  |

নলণীবন পইসন্তে হোহিসি একুমনা  || ধ্রু ||

জীবন্তে ভেলা বিহণি মএল ণঅণি  |

হণ বিণু মাংসে ভুসুকু পদ্মবন পইসহিণি ||ধ্রু ||

মাআজাল পসরিউ রে বাধেলি মা আহরিণী  |

সদ্ গুরুবোহেঁ বুঝি রে কাসু কহিনি  || ধ্রু ||১




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


যদি তুমি ভুসুকু শিকারে যাবে, মেরো সেই পাঁচজনকে |

নলিনীবনে প্রবেশ করতে হোয়ো একমনা  ||

জীবন্ত হল প্রভাত , মরল রজনী |

হনন-বিনা মাংসের জন্য ভুসুকু পদ্মবনে প্রবেশ করল  ||

মায়াজাল প্রসারিত করে রে বাঁধল মায়াহরিণী |

সদ্ গুরুর বোধে বুঝি রে, কার কাহিনী  ||




১ এরপর তিনটি পাতা পাওয়া যায়নি তার ফলে ২৩নং গীতের শেষ চার পংক্তি এবং ২৪,২৫ ---সংখ্যক গীত দুটি পাওয়া যায়নি |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ভুসুকু, তুমি শিকারে গেলে, মারবে পাঁচ জনে,

একাগ্রতা নিয়ে তখন যেয়ো পদ্মবনে।

বিহানে যারা জিন্দা, রাতে তারা মৃত্যুলোকে,

শিকার-বিনা মাংস পেতে ভুসুকু বনে ঢোকে।

মায়াজালের ফাঁদেই মায়া-হরিণ পড়ে মারা–

তারাই বোঝে, সদ্গুরুকে জিগেশ করে যারা।








-

-












-

-












কবি শান্তিপাদ

রাগ শীবরী | শান্তিপাদানাম্ |



তুলা ধুণি ধুণি আঁসুরে আঁসু |

আঁসু ধুণি ধুণি ণিরবর সেসু  || ধ্রু ||

তউ যে হেরুঅ ণ পাবিঅই |

সান্তি ভণই কিণ স ভাবিঅই ||ধ্রু ||

তুলা ধুণি ধুণি সুনে অহারিউ  |

পুণ  লইআ অপণা চটারিউ || ধ্রু||

বহল বট দুই মার ন দিশঅ |

সান্তি ভণই বালাগ ন পইসঅ  ||ধ্রু ||

কাজ ন কারণ জ এহু জুঅতি |

সঁএঁসংবেঅণ বোলথি সান্তি || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


তুলা ধুনে ধুনে আঁশ রে আঁশ  |

আঁশ ধুনে ধুনে নিরবয়ব শেষে ||

তবু সেই হেতু পাবেনা |

শান্তি বলেন , কেন সেরূপ ভাবা হয়  ||

তুলা ধুনে ধুনে শূন্যকে আহার করালাম  |

পুনর্বার নিয়ে নিজের মধ্যে চটিয়ে দিলাম১ ||

বিস্তৃত বর্ত , দুই মার্গ দেখা যায়না |

শান্তি বলেন , কেশাগ্র প্রবেশ করেনা ||

না কাজ না কারণ, ---যার এরূপ যুক্তি |

(তাকে ) স্বসংবেদন বলেন শান্তি  ||




১ আত্মলীন করে দিলাম |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

তুলা ধুনে ধুনে পাওয়া গেল আঁশ,

আঁশ ধুনে ধুনে আর কিছু নেই,

বোঝা তো গেল না কী যে হেতু তার–

শান্তি বলেন–ভাবো যেভাবেই।

তুলা ধুনে ধুনে খেলাম শূন্যতাকে,

পরে তো হলাম শূন্য নিজেই।

কাদা-ভরা পথ, দু’বার যায় না দেখা,

চুলেরও ঢোকার সামর্থ্য নেই।

কার্য কারণ কিছু নয়, কিছু নয়,

স্বয়ং-সংবেদন এ, শান্তি কয়।








কবি ভুসুকুপাদ

রাগ কামোদ | ভুসুকুপাদানাম্ |



অধরাতি ভর কমল বিকসউ  |

বতিস যোইণী তসু অঙ্গ উহ্লসিউ ||ধ্রু ||

চালিউঅ ষষহর মাগে অবধূই |

রঅণহু ষহজে কহেই  || ধ্রু||

চালিঅ ষষহর গউ নিবাণেঁ |

কমলিনি কমল বহই পণালেঁ || ধ্রু ||

বিরমানন্দ বিলক্ষণ সুধ |

জো এথু বুঝই সো এথু বুধ || ধ্রু||

ভুসুকু ভণই মই বুঝিঅ মেলেঁ |

সহজানন্দ মহাসুহ লীলেঁ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


অর্ধরাত্রি ভরে কমল বিকশিত হল  |

বত্রিশ যোগিনী তাদের অঙ্গ উল্লসিত করল  ||

চালিত হল শশধর অবধূতি মার্গে  |

রত্ন (প্রভাব ) হেতু সহজকে কহে  ||

চালিত শশধর গেল নির্বাণে  |

কমলিনী কমল (রসে ) বহে পদ্মনালে  ||

বিরমানন্দ বিলক্ষণ শুদ্ধ  |

যিনি এরূপ বোঝেন তিনি এখানে বুদ্ধ ||

ভুসুকু বলেন, আমি মিলনের দ্বারা বুঝলাম  |

সহজানন্দ মহাসুখলীলায়  ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

আধেক রাতভর পদ্ম ফোটে রাশি-রাশি,

হ’ল রে বত্রিশ যোগিনী-দেহ উল্লাসী।

চাঁদটা পার হ’য়ে যায় রে অবধূতি-সেতু,

রত্ন গুণে হয় সহজ চির-প্রকাশিত।

নির্বাণের খালে চালানো হ’ল শশধরে,

মৃণালে সরোবর পদ্ম যেরকম ধরে।

বিরমানন্দ যে বিলক্ষণ পরিশুদ্ধ

যে বোঝে এইখানে, কেবল সে-ই হয় বুদ্ধ।

ভুসুকু বলে তবে, পেয়েছি তার সাথে মিলে

সহজানন্দের নিত্য মহাসুখ-লীলে!








কবি শবরপাদ

রাগ বল্লাড্ডি | শবরপাদানাম্ |



উঞ্চা উঞ্চা পাবত তঁহি বসই সবরীবালী  |

মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী  || ধ্রু ||

উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরী  |

নিঅ ঘরিণী ণামে সহজ সুন্দারী  || ধ্রু ||

ণাণা তরুবর মৌলিলরে গঅণত লাগেলি ডালী  |

একেলী সবরী এ বণ হিন্ডই কর্ণ্ণকুন্ডলবজ্রধারী   || ধ্রু ||

তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুহে সেজি ছাইলী  |

সবরো ভুজঙ্গ ণইরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলী  || ধ্রু ||

হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই |

সুন নিরামণি কন্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই  || ধ্রু ||

গুরুবাক পুঞ্চআ বিন্ধ ণিঅমণে বাণেঁ |

একে সরসন্ধাণেঁ বিন্ধহ বিন্ধহ পরম নিবাণেঁ  || ধ্রু ||

উমত সবরো গরুআ রোসে  |

গিরিবরসিহরসন্ধি পইসন্তে সবরো লোড়িব কইসেঁ  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


উঁচু উঁচু পর্বত, সেখানে বাস করে শবরী--বালিকা |

ময়ূরপুচ্ছ পরিহিত শবরী  | গলায় গুঞ্জরী--মালিকা ||

উন্মত্ত শবর, পাগল শবর, না করিস গোল, দোহাই তোর |

নিজ ঘরণী নামে ( ও হল ) সহজসুন্দরী  ||

নানা তরুবর মুকুলিত হল, গগনে লাগল ডাল  |

একলা শবর এ-বনে ঢোঁড়ে, কর্ণকুন্ডলবজ্রধারী  ||

ত্রিধাতুখাট পাতল শবর, মহাসুখে শয্যা ছাইল  |

শবর ভুজঙ্গ১ , নৈরাত্মা দারী২, প্রেমে রাত পোহাল  ||

চিত্ত-তাম্বুল মহাসুখে কর্পূর খায়  |

শূন্য-নৈরাত্মাকে কন্ঠে নিয়ে মহাসুখে রাত পোহায়  ||

গুরুবাক্--ধনুকে বিদ্ধকর, নিজমন--বাণের দ্বারা  |

এক শরসন্ধানে বিদ্ধকর, বিদ্ধকর পরম নির্বাণকে ||

গুরু রোষে শবর উন্মত্ত |

গিরিবর-শিখর-সন্ধিতে প্রবেশ করে, শবর লড়বে কিরূপে ||




১ নাগর

২ বারবণিতা




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

উঁচু পর্বতে বাস করে এক শবরী বালা,

ময়ূরপুচ্ছ পরনে, গলায় গুঞ্জামালা।

মত্ত শবর, পাগল শবর, কোরো না গোল,

সহজিয়া এই ঘরনিকে নিয়ে দুঃখ ভোল্।

নানা গাছপালা, ডালপালা ঠ্যাকে আকাশ-তলে;

একেলা শবরী কুণ্ডলধারী বনস্থলে।

ত্রিধাতুর খাটে শবর-ভুজগ শেজ বিছায়,

নৈরামনির কণ্ঠ জড়িয়ে রাত পোহায়,

কর্পূরযোগে হৃৎ-তাম্বূল চিবায় সুখে,

আত্মাহীনার আসঙ্গ তার মত্ত বুকে–

গুরুবাক্যের ধনুকের তিরে আপন মন

গেঁথে ফেলে লভো পরিনির্বাণ, পরম ধন।

কোথায় লুকালে, শবর আমার, অন্ধকারে?

খুঁজব তোমাকে কোন্ গিরিখাতে, কোন্ পাহাড়ে?








কবি লুইপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | লুইপাদানাম্ |



ভাব ন হোই অভাব ণ  জাই |

আইস সংবোহেঁ কো পতিআই ||ধ্রু||

লুই ভণই বট দুলর্কখ বিণাণা  |

তিঅধাএ বিলসই উহ ণ ঠাণা  || ধ্রু ||

জাহের বান চিহ্ন রূব ণ জাণী  |

সো কইসে আগম বেএঁ বখাণী || ধ্রু||

কাহেরে কিষভণি মই দিবি পিরিচ্ছা |

উদক চান্দ জিম সাচ ন মিছা || ধ্রু ||

লূই ভণই মই ভাইব কীষ |

জা লই অচ্ছম তাহের উহ ণ দিস ||ধ্রু |||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


ভাব হয়না, অভাব যায় না  |

এরূপ সংবোধে১ কে প্রত্যয় করে ||

লূই বলেন, বিজ্ঞান দুর্লক্ষ বটে |

ত্রিধাতুতে বিলাস করে, ওখানে নেই ঠাঁই ||

যার বর্ণ, চিহ্ন, রূপ জানা নেই |

তাকে কিভাবে আগম-বেদ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় ||

কাকে কি বলে আমি দেব প্রশ্ন (-এর উত্তর )  |

উদকের চাঁদ যেমন সত্য, না মিথ্যা (? ) ||

লূই বলেন, আমি ভাব্ ব কিরূপে |

যা নিয়ে আছি, তার উদ্দেশ না দেখা যায় |||




১ ব্যাখ্যাতে |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ভাব-ও হয় না, না-যায় অভাবও,

এমন তত্ত্বে কী-বা জ্ঞান পাব?

লুই বলে, বোঝা ভীষণ কষ্ট,

ত্রিধাতু-বিলাসে হয় না স্পষ্ট।

যা-কিছু অরূপ, যা অতীন্দ্রিয়

আগম-বেদে কি তা ব্যাখ্যনীয়?

কী জবাব দেব–জলে বিম্বিত

চাঁদ সে সত্য, নাকি কল্পিত?

লুই বলে, কোনো কিছু নাই জানা,

কই আছি, নাই তারই যে ঠিকানা।








কবি ভুসুকুপাদ

ররাগ মল্লারী | ভুসুকুপাদানাম্ |



করুণ মেহ নিরন্তর ফরিআ |

ভাবাভাব দ্বংদ্বল দলিআ  || ধ্রু ||

উইত্তা গঅণ মাঝেঁ অদভুআ  |

পেখরে ভুসুকু সহজ সরূআ  || ধ্রু||

জাসু সুনন্তে তুট্টই ইন্দিআল |

নিহু রে নিঅমণ ণ দে উলাস || ধ্রু ||

বিসঅবিশুদ্ধিঁ মই বুঝ্ ঝিঅ আনন্দে |

গঅণহ জিন উজোলি চান্দে  || ধ্রু||

এ তৈলোএ এত বিষারা  |

জোই ভুসুকু  হেভ্ভই অন্ধকারা || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


করুণা-মেঘ নিরন্তর স্ফুরিত |

ভাবাভাব দ্বন্দ্বকে দলিত করে ||

উদিত গগণ মাঝে অদ্ভুত |

দেখ, রে ভুসুকু , সহজ স্বরূপ ||

যা শুনে টুটে ইন্দ্রজাল  |

নিভৃত রে নিজমন , না দেয় উল্লাস ||

বিষয়বিশুদ্ধি থেকে আমি বুঝলাম আনন্দে |

গগনে যেমন উজ্জ্বলিত হয় চাঁদ ||

এই  ত্রৈলোক্যে এই হল সার |

যোগী ভুসুকু বিদীর্ণ করে অন্ধকার ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

করুণার কালো মেঘ নিরন্তর ফুঁড়ে

ভাব-অভাবের দ্বন্দ্ব যায় ভেঙেচুরে।

আকাশে উদিত এক অতি-অপরুপ!

দ্যাখো রে, ভুসুকু, তার সহজ স্বরূপ।

ইন্দ্রিয়ের জাল টুটে যাবে, জানো যদি,–

মনের গহনে পাবে উল্লাসের নদী।

আনন্দ লভেছি বুঝে বিষয়-বিশুদ্ধি,

চাঁদের আলোর মতো বিকশিত বুদ্ধি;

এ-আলোকই ত্রিলোকের একমাত্র সার–

কেটে গেছে ভুসুকুর মনের আঁধার।








কবি আর্যদেবপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | আর্যদেবপাদানাম্ |



জহি মন ইন্দিঅ-পবণ হো ণঠা |

ণ জানমি অপা কহি গই পইঠা || ধ্রু ||

অকট করুণা ডমরুলি বাজঅ |

আজদেব নিরালে রাজই || ধ্রু ||

চান্দরে চান্দকান্তি জিম পতিভাসঅ  |

চিঅ বিকরণে তহি টলি পইসই  ||ধ্রু ||

ছাড়িঅ ভঅঘিণ লোআচার  |

চাহন্তে চাহন্তে সুণ বিআর || ধ্রু||

আজদেবেঁ সঅল বিহরিউ |

ভয় ঘিণ দুর নিবারিউ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


যেখানে মন (এবং) ইন্দ্রেয়পবন হয় নষ্ট |

না জানি আত্মা কোথায় গিয়ে প্রবেশ করে ||

আশ্চর্য করুণা- ডমরু বাজে |

আর্যদেব নিরালায় বিরাজিত থাকেন ||

চাঁদের চন্দ্রকান্তি যেরূপ প্রতিভাসিত হয় |

চিত্ত-বিকিরণ তেমনি টলে’ প্রবেশ করে ||

ছেড়ে ভয় ঘৃণা লোকাচার |

চেয়ে চেয়ে শূন্য বিচার কর ||

আর্যদেব দ্বারা সকল বিহরিত হল |

ভয় ঘৃণা দূরে নিবারিত হল ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

কী জানি কেমন ঘরে ঢুকলুম,

ইন্দ্রিয়-মন হ’য়ে গেল গুম।

করুণা-ডমরু শুধু বেজে যায়,

আর্যদেবের ঠাঁই নিরালায়।

অসংবেদনে ট’লে ঢোকে মন

চন্দ্রকান্তি চন্দ্রে যেমন–

দূর ক’রে ভয়, ঘৃণা, লোকাচার

চেয়ে চেয়ে দেখি শূন্য-বিকার।

ছেড়ে দিয়ে লোকলজ্জা সকল

আর্যদেবের সকলই বিকল।








কবি সরহপাদ

রাগ দেশাখ | সরহপাদানাম্ |



নাদ ন বিন্দু ন রবি ন সসিমন্ডল  |

চিঅরাঅ সহাবে মুকল ||ধ্রু ||

উজু রে উজু ছাড়ি মা লেহুরে বঙ্ক |

নিঅড্ হি বোহি মা জাহুরে লাঙ্ক || ধ্রু ||

হাথেরে কাঙ্কাণ মা লেউ দাপণ |

অপণে অপা বুঝ তু নিঅমণ ||ধ্রু ||

পার উআরেঁ সোই গজিই |

দুজ্জন সাঙ্গে অবসরি জাই ||ধ্রু ||

বাম দাহিণ জো খাল-বিখলা |

সরহ ভণই বপা উজুবাট ভাইলা ||ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


নাদ১ নয়, বিন্দু১ নয়, নয় রবিশশি-মন্ডল |

চিত্তরাজ স্বভাবে মুকুলিত ||

ঋজু রে, ঋজু ছেড়ে নিওনা রে  বাঁক |

নিকটেই বোধি, যেওনা রে লঙ্কা   ||

হাতে রে ( তোমার ) কাঁকণ, নিওনা দর্পণ |

নিজে নিজে বোঝ তুই নিজ মন ||

অপর পারে সে গজিয়ে ওঠে |

দুর্জনের সঙ্গে অপসৃত হয়ে যায় ||

বামে দক্ষিণে যে খাল-বিখাল |

সরহ বলেন , বাপু, সোজা পথ প্রতিভাত হল ||




১ পারিভাষিক শব্দ | বৌদ্ধতন্ত্রোক্ত যোনী-শুক্র |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

নাদ নয়, আর বিন্দুও না, সূর্য-চন্দ্র নয়,

চিত্তরাজা স্বস্বভাবে বাঁধন-মুক্ত হয়।

সোজা পথটা সামনে রেখে ধরিস না পথ বাঁকা,

লঙ্কা যা’স না, এই তো বোধি, নিজের মধ্যে ঢাকা!

আয়না নে’য়ার দরকার নাই কাঁকন-পরা হাতে,

নিজের মন না-বুঝলে নিজে, কী আর হবে তাতে?

ওগো যোগী, যাবে যদি ভবনদীর পার,

দুর্জনেরে সঙ্গে নিলে পার পাবে না আর।

ডাইনে-বাঁয়ে ভ’রে আছে নালা ডোবা খাল,

সরহ কয়, বাপু, তোমার সোজা রেখো হাল।








কবি টেন্টণপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | টেন্টণপাদানাম্ |



টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী |

হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী ||ধ্রু ||

বেগ সংসার বড্ হিল জাঅ |

দুহিল দুধু কি বেন্টে যামাঅ || ধ্রু ||

বলদ বিআএল গবিআ বাঁঝে |

পিটা দুহিএ এ তিনা সাঁঝে || ধ্রু ||

জো সো বুধী সৌধ নিবুধী  |

জো সো চৌর সৌ দুষাধী || ধ্রু ||

নিতে নিতে ষিআলা ষিহে ষম জুঝঅ |

টেন্টণপাএর গীত বিরলেঁ  বুঝঅ  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


টালেতে আমার ঘর, নেই পড়শী |

হাড়ীতে ভাত নেই, নিত্য অতিথি ||

বেগে সংসার বেড়ে যায়১ |

দোহন করা দুধ কি বাঁটে প্রবেশ করে ||

বলদ বিয়াল, গাই বাঁজা  |

পীটাতে দোহন হয় এই তিন সন্ধ্যা ||

যে সে বুদ্ধিমান সেই নির্বোধ |

যে সে চোর সেই প্রহরী ||

নিত্য নিত্য শৃগাল  সিংহের সঙ্গে যোঝে |

টেন্টণপাদের গীত বিরলে বোঝা যায় ||




১ অর্থটিতে সংশয় আছে |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

টোলায় আমার ঘর, প্রতিবেশী নাই;

অন্নহীন, নাই তবু ইষ্টির কামাই!

ব্যাঙ কি কামড় মারে সাপের শরীরে?

অথবা দোয়ানো দুধ বাঁটে যায় ফিরে?

বলদে বিয়ায় আর গাভি হয় বন্ধ্যা,

পিঁড়ায় দোয়ানো হয় তাকে তিন সন্ধ্যা–

যে জ্ঞানী সবার চেয়ে, অজ্ঞান সে ঘোর;

সবার চেয়ে যে সাধু, সেই ব্যাটা চোর!

শিয়াল-সিংহের যুদ্ধ চলে অনুক্ষণ–

লোকেরা বোঝে না, তাও বলেন ঢেণ্ঢন।








কবি শান্তিপাদ

রাগ শীবরী | শান্তিপাদানাম্ |



সুন করুণরি অভিণচারেঁ কাঅবাক্ চিঅ |

বিলসই দারিক গঅণত পারিম কুলেঁ  || ধ্রু ||

অলক্ষ লখচিত্তা মহাসুহে  |

বিলসই দারিক গঅণত পারিম কুলেঁ  || ধ্রু||

কিন্তো মন্তে কিন্তো তন্তে কিন্তো রে ঝাণবখানে |

অপইঠান মহাসুহলীণে দুলখ পরম নিবাণেঁ  || ধ্রু ||

দুঃখেঁ সুখেঁ একু করিঅ ভুঞ্জই ইন্দী জানী |

স্বপরাপর ন চেবই দারিক সঅলানুত্তর মাণী || ধ্রু ||

রাআ রাআ রাআরে অবর রাঅ মোহেরা বাধা |

লূইপাঅপএ দারিক দ্বাদশ ভুঅণেঁ লধা  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


শূন্য-করুণার অভিন্ন আচারের দ্বারা কায়-বাক্ চিত্তে |

বিলাস করেন দারিক গগনের পরম কূলে  ||

অলক্ষ লক্ষ-চিত্ত , মহাসুখে |

বিলাস করেন দারিক গগনের পরমকূলে  ||

কি হবে মন্ত্রে , কি হবে তন্ত্রে , কি হবে রে ধ্যানব্যাখ্যানে  |

অপ্রতিষ্ঠান মহাসুখলীন (অবস্থায় ) দুর্লক্ষ পরম নির্বাণ ||

দুঃখে সুখে এক করে ইন্দ্রিয় ভুঞ্জে  জ্ঞানী  |

স্বপর-অপরে পার্থক্য না করে দারিক সকল অনুত্তর মেনে নিলেন ||

রাজা, রাজা, রাজারে, অপর রাজা মোহে বাঁধা |

লূই- পাদপদ্মে দারিক দ্বাদশ ভুবন লাভ করল ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

শূন্য-করুণা, কায়-বাক্-চিৎ, এই অভিন্নাচারে

বিলাসে দারিক মত্ত হলেন আকাশের পরপারে।

অলক্ষ্যকেই বিলোকন ক’রে, মহাসুখ-অভিসারে

বিলাসে দারিক মত্ত হলেন আকাশের পরপারে।

কী তোর মন্ত্রে, কী তোর তন্ত্রে, কী ধ্যান-ব্যাখ্যানেই?

অপ্রতিষ্ঠ মহাসুখ যদি, নির্বাণ তবে নেই।

দুঃখ ও সুখ সম জ্ঞান ক’রে, ইন্দ্রিয়-উপভোগ,

আপন-পরের ভেদ ভুলে যেতে, দারিক করেন যোগ।

রাজা রাজা রাজা, আছে যত রাজা, সবাই ফক্কিকার–

দ্বাদশ দেশের রাজা এ-দারিক, লুইপাদ গুরু যার।








কবি ভাদেপাদ

রাগ মল্লারী | ভাদেপাদানাম্ |



এতকাল হাঁউ অচ্ছিলেঁসু মোহেঁ |

এবেঁ মই বুঝিল সদগুরুবোহেঁ || ধ্রু ||

এবেঁ চিঅরাঅ  মকুঁ ণঠা  |

গঅণসমুদেঁ টলিআঁ পইঠা  || ধ্রু ||

পেখমি দহদিহ সর্ব্বই শূন |

চিঅ বিহুন্নে পাপ ন পুন্ন  || ধ্রু ||

বাজুলে দিল মোহকখু ভণিআ  |

মই অহারিল গঅণত পনিআ || ধ্রু ||

ভাদে ভনই অভাগে লইঅ  |

চিঅরাঅ মই অহার ক এলা || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


এতকাল আমি ছিলাম মোহে |

এবার আমি বুঝলাম সদ্ গুরুর বোধে  ||

এখন চিত্তরাজ আমার কাছে নষ্ট |

গগন-সমুদ্র টলে প্রবিষ্ট  ||

দেখি দশদিক সবই শূন্য |

চিত্ত-বিনা না পাপ না পুণ্য ||

বাজুল১  দিল মোক্ষ বলে  |

আমি আহার করলাম গগনের পানী  ||

ভাদে বলেন, অভাগ্য লয়ে২ |

চিত্তরাজকে আমি আহার করলাম  ||




১ বজ্রকুল

২ দুর্ভাগ্যক্রমে




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

এতকাল আমি ছিলাম অন্ধ স্বমোহাবেশে,

সদ্গুরু রোগ সারিয়ে দিলেন সদুপদেশে।

এতকাল মন নিমগ্ন ছিল মনের তলে,

আকাশ যেমন ঢ’লে প’ড়ে যায় সাগরজলে।

দশ দিকে ছিল মহাশূন্যের মহা-আঁধার,

এ-মনে ছিল না পাপপুণ্যের কোনো বাধা।

বজ্র আমাকে খাওয়াল সে শেষে মোক্ষফল,

মহাতৃপ্তিতে পান করলাম আকাশজল–

ভাদে বলে, আমি ভাগ্যকে দিয়ে জলাঞ্জলি

নিজ মন খেয়ে, সুখদুঃখের ঊর্ধ্বে চলি।








কবি কৃষ্ণাচার্যপাদ

রাগ পটমঞ্জরী | কৃষ্ণাচার্যপাদানাম্ |



সুণ বাহ তথতা পহারী |

মোহ ভন্ডার লই সঅলা অহারী || ধ্রু ||

ঘুমই ণ চেবই সপরবিভাগা  |

সহজ নিদালু কাহ্নিলা লাঙ্গা   ||ধ্রু ||

চেঅণ ণ বেঅণ ভর নিদ গেলা  |

সঅল সুফল করি সুহে সুতেলা ||ধ্রু ||

স্বপণে মই দেখিল তিহুবণ সুণ  |

ঘোরিঅ অবণাগমণ বিহুণ  ||ধ্রু ||

শাখি করিব জালন্ধরি পাএ |

পাখি ণ রাহত মোরি পান্ডিআচাদে ||ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


শূন্যতা বাহু, তথতা প্রহারক |

মোহ ভান্ডার লয়ে সব আহার করে ||

না ঘুমন্ত, না জাগ্রত, স্ব-পর বিভাগ১  |

সহজে নিদ্রালু কানাই উলঙ্গ ||

না চেতনা, না বেদনা, ভরা নিদ্রা গেল  |

সব সফল করে সুখে শয়ন করল  ||

স্বপ্নে আমি দেখলাম ত্রিভুবন শূন্য |

ঘুরি গমনাগমন বিহীন (ভাবে )  ||

সাক্ষী করব জালন্ধরীপাদকে  |

পক্ষে না রয় আমার পন্ডিতাচার্য  ||




১ আত্মপর  বোধের  মাঝামাঝি  অবস্থা




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

তথতার মারে শূন্য বাসনা-আগার,

উজাড় করেছি সব মোহের ভাঁড়ার;

বেঘোর সহজ নিদে উলঙ্গ কানাই,

এই ঘুমে আত্ম-পর ভেদাভেদ নাই,

চেতনা-বেদনা নাই–খুলে আবরণ

সুখময় ঘুমে কানু হ’ল অচেতন।

স্বপনে হেরিনু আমি, শূন্য ত্রিভুবন

গমনাগমনহীন ঘানির মতন–

সাক্ষী জালন্ধরীপাদ–কারণ, আমায়

পণ্ডিতে চেনে না পাশমুক্ত অবস্থায়।








কবি তাড়কপাদ

রাগ কামোদ | তাড়কপাদানাম্ |



অপনে  নাহিঁ মো কাহেরি সঙ্কা |

তা মহামুদেরি টুটি গেলি কংখা || ধ্রু ||

অনুভব সহজ মা ভোলরে জোঈ  |

চৌকোড্ হি বিমুকা জইসো তইসো হোই  ||ধ্রু ||

জইসনে অছিলেস তইসনে অচ্ছ |

সহজ পিথক জোই ভান্তি মাহো বাস || ধ্রু ||

বান্ডকুরুন্ড সন্তারে জাণী  |

বাক্ পথাতীত কাঁহি বখাণী  ||ধ্রু ||

ভনই তাড়ক এষু নাহি অবকাশ |

জো বুঝই তা গলেঁ গলপাস || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


আপনাতে নেই আমি , কার শঙ্কা |

তবে মহামুদ্রার টুটে গেল আকাঙ্খা ||

অনুভব কর সহজ , ভুলো না রে যোগী |

চতুষ্কোটি বিমুক্ত যেরূপ সেরূপ হও ||

যেরূপ ছিলে সেরূপ আছ |

সহজ পৃথক, যোগী ভ্রান্তিমধ্যে থেকোনা ||

বান্ডকুরুন্ড১ সাঁতারেই জানা যায় |

বাক্ পথাতীত কিরূপে ব্যাখ্যা করি  ||

বলেন তাড়ক , এর নেই অবকাশ  |

যে বোঝে , তার গলে গলপাশ  ||




১ পুরুষাঙ্গ- অন্ডকোষ




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

আমিই যদি আমাতে নেই, কীসের তবে ভয়?

মহামুদ্রা লাভের আশা আমার জন্য নয়।

সহজেরে বোঝ্ রে, যোগী, ভুলিস না রে ভবী,

চতুষ্কোটি মুক্ত যেমন, তেম্নি মুক্ত হবি।

যেরকম ইচ্ছা হবে সেরকমই থাকো,

সহজিয়া পথটাকে ভুলে যেয়ো না কো;

মেঢ্র ও অণ্ডের ক্রিয়া জাহের, সাঁতারে,

বাতেনি যা, বুঝি কোন্ তরিকায় তারে?

তাড়ক বলেন, বড় গুরু সমস্যাটা,

যারা বোঝে, তাদের গলায় ফাঁস আঁটা।








কবি সরহপাদ

রাগ ভৈরবী | সরহপাদানাম্ |



কাঅ ণাবড্ হি খান্টি মণ কে আল |

সদ্ গুরু বঅণে ধর পতবাল || ধ্রু ||

চীঅ থির করি ধরহু রে নাহী  |

অন উপায়েঁ পার ণ জাই || ধ্রু ||

নৌবাহী নৌকা টাণঅ গুণে  |

মেলি মেলি সহজেঁ জাউ ণ আণেঁ ||ধ্রু ||

বাটঅ ভঅ খান্ট বি বলআ |

ভব উলোলেঁ ষঅবি বোলিআ || ধ্রু ||

কুল লই খরে সোন্তে উজাঅ  |

সরহ ভণই গঅণেঁ পমাএঁ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


কায়া নৌকা, খাঁটি মন বৈঠা |

সদ্ গুরুর বচনে ধর হাল  ||

চিত্ত স্থির করে ধর রে নৌকা  |

অন্য উপায়ে পারে যেতে পারবে না ||

নৌবাহী নৌকা টানে গুণে |

মিলে মিলে সহজে অন্য (দিকে ) যায় না ||

বাটেতে ভয়, দস্যুও বলবান  |

ভব-তরঙ্গে সবই নিমজ্জিত  ||

কুল নিয়ে খরস্রোতে উজিয়ে চল |

সরহ বলেন, গগনে প্রবেশ কর ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

দেহরূপ নায়ে বৈঠা মন,

হাল ধরো সদ্গুরুর বচন,

মন স্থির ক’রে ব’সো গো নায়ে,

পারে যাওয়া নাই অন্য উপায়ে।

সহজে নৌকা গুণ টেনে নাও,

হে মাঝি, যেয়ো না আর-কোথাও।

পথে পথে আছে ডাকাতের ভয়,

ভব-দরিয়ার ঢেউয়ে, বিলয়।

কূল ধ’রে, স্রোতে বাইলে উজানে

নৌকা ঢুকবে সোজা আসমানে।








কবি সরহপাদ

রাগ মালশী | সরহপাদানাম্ |



সুইণা হথ বিদারম রে |  নিঅ মণ তোহোরেঁ দোসেঁ  ||

গুরুবঅণ বিহারেঁরে  | থাকিব তই ঘুন্ড কইসে || ধ্রু ||

অকট হূঁ ভবই গঅণা |

বঙ্গে জায়া ণিলেসি পরে ভাগেল তোহোর বিণাণা || ধ্রু ||

অদঅভুঅ ভব মোহা রে | দিসই পর অপ্যণা |

এ জগ জলবিম্বকারে সহজেঁ সুণ অপণা ||ধ্রু ||

অমিআ আছন্তেঁ বিস গিলেসি রে |  চিঅ পরবস অপা  |

ঘারেঁ পারে কা বুজ্ ঝিলে ম রে খাইব মই দুঠ কুন্ডুবা || ধ্রু||

সরহ ভণন্তি বর সুণ গোহালী কি মো দুঠ্য বলংদেঁ |

একেঁলে জগ নাসিঅ রে বিহরুঁ ইচ্ছন্দ্রেঁ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


শূন্য হস্ত শিথিল কর্ বে | নিজমন তোর দোষে  |

গুরু-বচন-বিহারে রে থাকবি তুই ঘুরতে কিভাবে ||

আশ্চর্য হুঙ্কারোদ্ভব গগন |

বঙ্গে জায়া নিয়েছিস , পরে ভাগল তোর বিজ্ঞান  ||

অদ্ভুত ভবমোহ রে | দেখায় পরকে আপন |

এই জগৎ জলবিম্বাকার |  সহজে শূন্য আপন ||

অমিয় থাকতে বিষ গিলিস রে | চিত্ত পরবস আপণা থেকে |

ঘরে-পরে কি বুঝলাম আমি রে |  খাব আমি দুষ্ট কুটুম্ব ||

সরহ বলেন, বরং শূন্য গোয়াল (ভাল ), কি (কাজ ) আমার দুষ্ট বলদে |

একলা জগৎ নাশিত রে | বিহার করি ইন্দ্রিয়-ইচ্ছায় ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

মন রে, আমার স্বপ্নেও তুই হায়

আপন দোষে আছিস অবিদ্যায়!

মন, কী ক’রে আর গুরুবচন–

বিহারে তুই করবি পর্যটন?

গগনকোণে আজব হুহুঙ্কার–

বঙ্গে জায়া নিয়ে গেলি, আর

বিজ্ঞান তোর হ’ল যে মিসমার!

অদ্ভুত এই ভবের মোহে, মন,

পরকেও তুই দেখিস রে আপন–

জগৎ যেন জলের মুকুর, আত্মা

সহজে হয় শূন্য ও লাপাত্তা।

চিত্ত আমার, নিত্য পরবশ,

বিষ গিলেছিস ফেলে সুধারস।

ঘরে-বাইরে কে আছে কে জানে,

দুষ্ট কুটুম দুঃখ শুধু হানে,

ইচ্ছা লাগে মারতে তাদের প্রাণে–

দুষ্ট বলদ থাকার চেয়ে তবে

শূন্য গোয়াল অনেক ভালো হবে!

একলা থাকি সুখে ও স্বচ্ছন্দে,

জগৎ দূরে যাক–সরহ বন্দে।








কবি কাহ্নপাদ

রাগ মালসীগবুরা | কাহ্নপাদানাম্ |



জো মণগোঅর আলাজালা |

আগমপোথী ইষ্টমালা  || ধ্রু ||

ভণ  কইসেঁ সহজ বোলবা জাঅ  |

কাঅ বাক্ চিঅ জসু ণ সমাঅ || ধ্রু ||

আলে গুরু উএসই সীস   |

বাক্ পথাতীত কাহিব কীস || ধ্রু ||

জেতই বোলি তেতবি টাল  |

গুরু বোব সে সীস কাল  || ধ্রু ||

ভণই কাহ্ন জিণরঅণ বি কইসা |

কালে বোব সংবোহিঅ জইসা || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


যা মনগোচর (তা ) আলাজালা১ |

আগমপুথি, ইষ্টমালা ||

বল কেমন করে সহজ বলা যায় |

কায়-বাক্-চিত্ত যেখানে ঢুকতে পারে না ||

বৃথা গুরু উপদেশ দেয় শিষ্যকে |

বাক্ পথাতীতকে বলবে কিভাবে ||

যতই বলা হয় ততই টাল-মাটাল২ |

গুরু বোবা, সে শিষ্য কালা ||

কাহ্ন বলেন, জিনরত্ন বা কেমন |

কালাকে বোবা বুঝায় যেমন ||




১ ইন্দ্রজাল

২  অসংলগ্ন




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

মনোগোচর যা, তা-ই ধোঁকা,

আগমপুথি, তসবিমালা।

অতীন্দ্রিয় সহজ আমি

ব্যাখ্যা করি কোন্ ভাষাতে?

বৃথাই, গুরু, শিষ্যটিকে

মাথামুণ্ডু চাও বোঝাতে,

কথায় বাড়ে প্রমাদ শুধু–

গুরু সে বোবা, শিষ্য কালা!

কানু বলেন, সহজ এই:

বোবায় বোঝে, বললে কালা।








কবি ভুসুকুপাদ

রাগ কহ্নগুঞ্জরী | ভুসুকুপাদানাম্ |



আইএ অণুঅনা এ জগ রে ভাংতিএঁ সো পড়িহাই |

রাজসাপ দেখি জো চমকিই সাচে কিং তং বোড়ো খাই || ধ্রু ||

অকট জোইআ রে মা কর হথা লোহ্ণা  |

আইস সহাবে জই জগ বুঝষি তুটই বাষণা তোরা || ধ্রু ||

মরুমরীচি গন্ধ (ব্ব ) নইরী দাপতিবিম্বু জইসা |

বাতাবত্তেঁ সো দিঢ় ভইআ অপেঁ পাথর জইষ || ধ্রু||

বাঁধিসুআ জিম কেলি করই খেলই বহুবিহ খেড়া |

বালুআতেলেঁ সসরসিংগে আকাশে ফুলিলা  ||ধ্রু ||

রাউতু ভনই কট ভুসুকু ভনই কট সঅলা অইস সহাব |

জই তো মূঢ়া অচ্ছসি ভান্তী পুচ্ছ তু সদ্ গুরু পাব || ধ্রু||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


আদিতে অনুত্পন্ন এই জগৎ রে, ভ্রান্তিতে সে প্রতিভাত |

রজ্জুসর্প দেখে যে চমকায়, সত্য কি তাকে বোড়োখায়  ||

আশ্চর্য যোগী রে, না কর হাত লোনা |

এই স্বভাবে যদি জগৎকে বুঝিস , টুটে বাসনা তোর ||

মরু-মরীচিকা, গন্ধর্বনগরী , দপর্ণ-প্রতিবিম্ব যেরূপ |

বাতাবর্তে সেই দৃঢ়ীভূত হয়ে জল যেমন প্রস্তরবৎ ||

বন্ধ্যাসুত যেমন খেলা করে, খেলে বহুবিধ খেলা  |

যেমন বালুকাতেলে, শশকশৃঙ্গে আকাশ প্রফুল্ল হয় ||

রাউতু১ বলেন, আশ্চর্য, ভুসুকু বলেন , আশ্চর্য , সকলের এই স্বভাব |

যদি তোর, মূঢ় , থাকে ভ্রান্তি , জিজ্ঞাসা কর্ তুই সদ্ গুরুর পাদে ||




১  রাজপুত্র




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

এ-জগৎ অনুৎপন্ন আদিতে, ভ্রান্তিতে প্রতিভাত।

রজ্জুকে যে সর্প ভাবে তাকে কি কামড়ায় চন্দ্রবোড়া?

অদ্ভুত হে যোগী, মিছা কোরো না তোমার হাত নোনা,

বাসনা টুটবেই, যদি জগতের রীতি বুঝতে পারো।

যেন, মরু-মরীচিকা, গন্ধর্বনগরী, মুকুরের

প্রতিবিম্ব, বাত্যাবর্তে ঘন হ’য়ে শিল-হওয়া জল,

যেন বহুবিধ খেলা খেলে চলে বন্ধ্যার দুলাল–

খেলে খরগোশের শিং, বালুতেল, আকাশকুসুমে–

রাজপুত্র ভুসুকুপা বলে, সব এরকমই বটে,

গুরুর শরণ নাও, যে এখনও আছো ভ্রান্ত পথে।








কবি কাহ্নপাদ

রাগ কামোদ | কাহ্নপাদানাম্ |



চিঅ সহজে শূণ সংপুন্না |

কান্ধ-বিয়োএ মা হোহি বিসন্না || ধ্রু ||

ভন কইসে কাহ্ন নাহি |

ফরই অনুদিন তৈলোএ পমাই || ধ্রু||

মূঢ়া দিঠ নাঠ দেখি কাঅর |

ভাগতরঙ্গ কি সোষই সাঅর || ধ্রু ||

মূঢ়া অছন্তে লোঅ ন পেখই |

দুধ মাঝেঁ লড় ণচ্ছংতেঁ দেখই|| ধ্রু||

ভব জাই ণ আবই এসু কোই |

অইস ভাবে বিলসই কাহ্নিল জোই || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


চিত্ত সহজে শূন্য (দ্বারা ) সম্পূর্ণ  |

স্কন্ধ বিয়োগে১  হোয়ো না বিষন্ন ||

বল কিসে কানু নেই |

স্ফুরিত হয় অনুদিন, ত্রৈলোক্যে প্রবেশ করে ||

মূঢ় নষ্ট দৃশ্য দেখে কাতর |

তরঙ্গ-ভঙ্গ কি সাগর শোষে ||

মূঢ় অস্তিত্বমান লোককে দেখে না  |

দুধের মাঝে (যেমন ) ননী থাকলেও দেখা যায় না ||

এই  ভবে কেউ যায় আসে না |

এই ভাবে বিলাস করেন কাহ্নিল যোগী  ||




১ রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান নির্মিত দেহত্যাগে  |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

শূন্যে পূর্ণ চিত্ত সহজে,

কাঁধ ভেঙে গেলে দুঃখ নেই;

কানু ম’রে গেছে, তোমরা কহ যে–

সে আছে ত্রিলোকে সবখানেই।

দৃশ্যলোপে যে বুক-দুরুদুরু,

ঢেউ কি কখনও শোষে সাগর?

দেখে না চক্ষু-বিহীন মূঢ়

দুধে-মিশে-থাকা দুধের সর।

আসে না যায় না কেউ এ-ঠাঁই,

এই বুঝে কানু আছে তোফাই।








কবি ভূসুকুপাদ

ররাগ বঙ্গাল | ভূসুকুপাদানাম্ |



সহজ মহাতরু ফরিঅ এ তৈলোএ |

খসম সভাবে রে বাণত মুকা কোএ || ধ্রু ||

জিম জলে পাণিআ টলিআ ভেউ ন জাঅ |

তিম মণ-রঅণারে সমরসে গঅণ সমাঅ || ধ্রু||

জাসু ণাহি অধ্যা তাসু পরেলা কাহি |

আই অনুঅনারে জাম মরণ ভব নাহি || ধ্রু ||

ভুসুকু ভণই কট রাউতু ভণই কট সঅলা এহ সহাব |

জাই ণ আবয়ি রে ণ তঁহি ভাবাভাব || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


সহজ মহাতরু স্ফুরিত এ ত্রিলোকে |

শূন্য-সম স্বভাবে রে বর্ণেতে মুক্ত কে ||

যেমন জলে পানী টললে১   ভেদ  করা যায়না |

তেমনি মনোরত্ন রে সমরসে গগনে প্রবেশ করে ||

যার নেই আত্মবোধ তার পরবোধ কোথায় |

আদিতে যে অনুত্পন্ন রে, (তার ) জন্ম মরণ ভব নেই ||

ভুসুকু বলেন, আশ্চর্য, রাউতু বলেন, আশ্চর্য, সকলের এই স্বভাব |

যার আসেনা রে, নেই তাতে ভাবাভাব ||




১ জলে জল পড়লে  |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

ফোটে সহজিয়া মহাতরু ত্রৈলোক্যে।

শূন্য-স্বভাবে বন্ধনহীন নয় কে?

সমরসে মনোরত্ন আকাশে মেশে,

পানিতে যেমন পানি মেশে নিঃশেষে।

পর নাই তার, যার কেউ নাই আপনা;

জন্ম হয় নি যার, সে কখনও মরে না।

ভুসুকু বলেন, প্রকৃতির রীতি এই:

আনাগোনা আর ভাবাভাবে স্থিতি নেই।








কবি কঙ্কণপাদ

রাগ মল্লারী | কঙ্কণপাদানাম্ |



সুনে সুন মিলিও জবেঁ |

সঅল ধাম উইআ তবেঁ || ধ্রু ||

আছহুঁ চউঋণ সংবোহী  |

মাঝ নিরোহেঁ অনুঅর বোহী || ধ্রু ||

বিদুনাদ ণ হিঁ এ পইঠা  |

আণ চাহন্তে আণ বিণঠা || ধ্রু ||

জঁথা আইলেসি তথা জান |

মাঝঁ থাকী সঅল বিহণ || ধ্রু ||

ভণই কঙ্কণ কলএল সাদেঁ |

সর্ব্ব বিচুরিল তথতা নাদেঁ || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


শূন্যে শূন্য যখন মিলিত |

সকল ধর্ম তখন উদিত হয় ||

আছি চতুঃক্ষণ সংবোধিতে |

মাঝের নিরোধে অনুত্তর বোধী ||

বিন্দু-নাদ নয় চিত্তে প্রবিষ্ট  |

এক চাইতে অন্য বিনষ্ট ||

যেখান থেকে এসেছ তাকে জান |

মধ্যে থেকে সর্ববিহীন ||

কঙ্কণ বলেন কলকল শব্দে |

সব বিচূর্ণ হল তথতানাদে ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

শূন্যে শূন্য মিললে তবে

সকল ধর্ম উদিত হবে।

অনুখন আছি এ-সংবোধে:

বোধির বিততি মাঝ-নিরোধে।

বিন্দু-নাদ না-ঢোকে হিয়ায়,

একটি চাইলে আরটি যায়!

কোত্থেকে এলে, সেইটে জানো,

মাঝখানে থেকে আঘাত হানো।

ভনে কলকল কাঁকনপাদে,

সবকিছু বুঁদ তথতা-নাদে।








কবি ভাদেপাদ

রাগ মল্লারী | কাহ্নপাদানাম্ |



মণ তরু পাঞ্চ ইন্দি তসু সাহা |

আসা বহল পাতহ বাহা || ধ্রু ||

বড় গুরু বঅণে কুঠারেঁ ছিজঅ |

কাহ্ন ভণই তরু পুণ ন উইজঅ || ধ্রু ||

বাঢ়ই সো তরু সুভাসুভ পাণী  |

ছেবই  বিদুজন গুরু পরিমাণী || ধ্রু ||

জো তরু ছেব ভেবউ ন জাণই |

সড়ি পড়িআঁ রে মূঢ় তা ভব মাণই || ধ্রু ||

সুন তরুবর গঅণ  কুঠার |

ছেবই সো তরু মূল ন ডাল || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


মন তরু  (হল ) পঞ্চ ইন্দ্রিয় তার শাখা |

আশা (তার ) বহুবিধ পত্র-বাহার  ||

বড় গুরুর বচন-কুঠারের দ্বারা ছিন্ন কর |

কাহ্ন বলেন, তরু পুনরায় গজাবেনা  ||

বাড়ে সেই তরু শুভাশুভ পানীতে |

ছেদন করেন বিদ্বজ্জন গুরুকে সাক্ষ্য রেখে ||

যে তরুর ছেদন-ভেদন জানে না |

পদস্খলিত হয়ে রে, মূঢ় তাকে ভব বলে মেনে নেয়  ||

শূন্য তরুবর, গগন কুঠার  |

ছেদন কর সেই তরু, মূল ও ডাল না ( রেখে ) ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

পঞ্চেন্দ্রিয় শাখা মন-তরুটাতে,

আশারূপ ফল পাতা শোভা পায় তাতে।

সদ্গুরু কাটে তরু বচন-কুড়ালে;

কানু বলে, এ-জীবন পাবে না, ফুরালে।

সেই তরু বাড়ে পাপপুণ্যের জলে,

বিদ্বান্ কাটে তারে গুরু-কৃপা-বলে।

তরুটার ছেদ-ভেদ না-জানে যে-বোকা

পৃথিবী সত্য ভেবে খায় সে যে ধোঁকা।

শূন্য সে-তরুবর, আকাশ কুড়াল–

শিকড়ে বসাও কোপ, ছেঁটো না রে ডাল।








ককবি জয়নন্দীপাদ

ররাগ শবরী | জয়নন্দীপাদানাম্ |



পেখু সুঅণে অদশ জইসা |

অন্তরালে মোহ তইসা || ধ্রু ||

মোহ বিমুক্কা জই মণা |

তবেঁ তুটই অবণাগমণা || ধ্রু ||

নৌ দাঢ়ই নৌ তিমই ন ছিজই  |

পেখ মাআ মোহে বলি বলি বাঝই || ধ্রু ||

ছাআ মাআ কাঅ সমাণা  |

বেণি পাখেঁ সোই বি ণাণা || ধ্রু ||

চিঅ তথতাস্বভাবে ষোহিঅ |

ভণই জঅনন্দি ফুড় অণ ণ হোই || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


স্বপ্নে দেখা আদর্শ যেরূপ |

অন্তরালে মোহ সেরূপ  ||

মোহ-বিমুক্ত যদি মন |

তবে টুটে অবনাগমন ||

না দগ্ধ হয়, না প্লাবিত হয়, না ছিন্ন হয় |

দেখ, মায়ামোহে বারবার বদ্ধ হয় ||

কায়া ছায়া-মায়ার সমান |

দুই পাখায় সে-তো বহু ||

চিত্ত তথতা-স্বভাবে শোধিত |

জয়নন্দী বলেন, (এটা ) স্পষ্ট (যে ) অন্য হয় না ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

স্বপ্ন যেমন বহু অদেখা দেখায়

অন্তরে সংসার তেম্নি যে হায়!

শেষ হ’লে হৃদয়ের মোহজাল বোনা

থেমে যায় মন-পথে যত আনাগোনা।

না সে পোড়ে, না সে ভেজে, ছিঁড়েও না মন,

দ্যাখো মায়া-মোহে তার দৃঢ় বন্ধন।

ছায়া-মায়া-কায়া এরা সমান সবাই,

নানা শোভা ধরে তার উভয় পাখাই।

তথতা-সাধনে করো শুদ্ধ হৃদয়,

আর পথ নাই–জয়নন্দী ভনয়।








কবি ধামপাদ

রাগ গুর্জরী | ধামপাদানাম্ |



কমল কুলিশ মাঝেঁ ভইঅ মিঅলী |

সমতা জোএঁ জলিঅ চন্ডালী || ধ্রু ||

ডাহ ডোম্বী ঘরে লাগেলি আগি |

সসহর ষলিলই ষিঞ্চহুঁ পাণী || ধ্রু ||

ণউ খর জালা ধুম ণ দিশই |

মেরু শিখর লই গঅণ পইসই || ধ্রু ||

দাঢ়ই হরিহর বাহ্ম ভরা |

ফীটা হই নবগুণ শাসনপড়া || ধ্রু ||

ভণই ধাম ফুড় লেহূরে জাণী  |

পঞ্চ নালেঁ উঠে গেল পাণী || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


কমল ও কুলিশের মধ্যে মিত্রতা হল |

সমতাযোগে জ্বলল চন্ডালী ||

দগ্ধ ডোম্বী-ঘরে লাগল আগুন |

শশধর--সলিলে সিঞ্চন করি পানী ||

নাই খরজ্বালা না ধুম দেখা যায় |

মেরুশিখর ধরে গগনে প্রবেশ করে ||

দগ্ধ করে হরি-হর-ব্রহ্ম-ভট্টারককে |

নবগুণ (পৈতা ) ও শাসনপাটা ধ্বংস হয় ||

বলেন ধাম, স্পষ্ট নাও রে জেনে |

পঞ্চনালে উঠে গেল পানী ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

কমল-কুলিশ মাঝে হলাম মিলিত,

চণ্ডালী সমতা-যোগে হ’ল প্রজ্বলিত।

ডোমনির কুঁড়েঘরে আগুন লেগেছে,

আগুন নেবাই চাঁদ দিয়ে পানি সেচে।

জ্বালা খুব তেজি, তবু কোনো ধোঁয়া নেই,

মেরুশীর্ষ নিয়ে পশে সোজা গগনেই।

পোড়ে ব্রহ্মা, হরিহর, পুড়ে হয় মুক্ত

তামার শাসনপট্ট, নবগুণযুক্ত।

ধামপাদ বলে, আজ সব স্পষ্ট জানি,

পঞ্চনালে উঠে গেল নির্বাণের পানি।








-

-












কবি ভুসুকুপাদ

রাগ মল্লারী | ভুসুকুপাদানাম্ |



বাজ ণাব পাড়ী পঁউআ খালেঁ বাহিউ |

অদঅ বঙ্গালে১ দেশ লুড়িউ || ধ্রু ||

আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী  |

নিঅ ঘরিণী চন্ডালী লেলী  || ধ্রু||

ডহি জো পঞ্চ পাটণ ইংদি বিসআ ণঠা |

ণ জানমি চিঅ মোর কহিঁ গই পইঠা || ধ্রু ||

সোণ ত রুআ মোর কিম্পি ণ থাকিউ  |

ণিঅ পরিবারে মহা নেহে থাকিউ || ধ্রু ||

চউকোডি ভন্ডার মোর লইআ সেস |

vজীবন্তে মইলেঁ নাহি বিশেষ  || ধ্রু ||




১ সেন দঙ্গালে (দস্যু অর্থে )|




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


বজ্রনৌকা পেড়ে পদ্মখালে বাওয়া হল১ |

অদ্বয় বাঙ্গালের২ দ্বারা দেশ লুঠ হল ||

আজ ভুসুকু বাঙ্গালী হল |

নিজ ঘরনী (রূপে ) চন্ডালীকে নিল || ৩

দগ্ধ যে পঞ্চ পাট, ইন্দ্রিয় বিষয়  নষ্ট |

জানিনা চিত্ত মোর কোথায় গিয়ে প্রবিষ্ট ||

স্বর্ণ এবং রূপা আমার কিছুই থাকল না |

নিজ পরিবারে মহা স্নেহে থাকলাম ||

চতুষ্কোটি ভান্ডার আমার নিয়ে শেষ (করল ) |

জীবন্তে-মৃতে নাই বিশেষ  ||




১ বজ্রনৌকা পদ্মযানে চালানো তান্ত্রিক দেহ--সাধনায় নরনারীর সঙ্গম-সূচক |

২  দঙ্গাল বা দস্যুর দ্বারা |

৩ ভুসুকুর চন্ডালিনীকে ঘরণীরূপে গ্রহণ ও তান্ত্রিক সাধনায় নিন্মবর্ণের নারীতে উপগত হওয়ার দ্যোতক |




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

বজ্রনৌকা বেয়ে পাড়ি দেই পদ্মা খাল,

দেশ লুট ক’রে নিল অদয় বঙ্গাল।

ভুসুকু, বাঙালি হলি আজ থেকে ওরে,

নিজের ঘরনি গেল চাঁড়ালের ঘরে।

জানি না কোথায় ঢুকে মন হ’ল ভ্রষ্ট,

জ্বলন্ত পঞ্চপাটন, ইন্দ্রিয় বিনষ্ট।

সোনা-রুপা কিছু আর রইল না বাকি,

নিজ পরিবারে তবু মহাসুখে থাকি–

নিঃশেষ হয়েছে যদি চৌকোটি ভাঁড়ার

জীবন-মরণে নাই প্রভেদ আমার।








কবি শবরপাদ

রাগ রামক্রী | শবরপাদানাম্ |



গঅণত গঅণত তইলা বাড়্ হী হেঞ্চে কুরাড়ী |

কন্ঠে নৈরামণি বালি জাগন্তে উপাড়ী || ধ্রু ||

ছা ছা মাআ মোহা বিষম দুন্দোলী  |

মহাসুহে বিলসন্তি শবরো লইআ সুণ মেহেলী || ধ্রু ||

হেরি যে মেরি তইলা বাড়ী খসমে সমতুলা  |

ষুকড় এ সে রে কপাসু ফুটিলা || ধ্রু ||

তইলা বাড়ির পাসের জোহ্ণা বাড়ি উএলা  |

ফিটেলি অন্ধারী রে অকাশ ফুলিআ || ধ্রু ||

কঙ্গুরিনা পাকেলা রে শবরাশবরি মাতেলা |

অণুদিন সবরো কিংপি ন চেবই মহাসুহেঁ ভেলা || ধ্রু ||

চারিবাসে তা ভলা রে দিআঁ চঞ্চালী |

তঁহি তোলি শবরো ডাহ কএলা কান্দশ সগুণ শিআলী || ধ্রু ||

মারিল ভবমত্তা রে দহদিহে দিধলী বলী  |

হের সে শবরো ণিরেব্ ণ ভইলা ফিটিলি ষব সলী  || ধ্রু ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ


গগনে গগনে ত্রিতল বাড়ী, হৃদয় কুঠার |

কন্ঠে নৈরাত্মা বালিকা, জেগে উত্পাটিত করে ||

ছাড়, ছাড়, মায়া-মোহ বিষম দ্বন্দ্বকারী |

মহাসুখে বিলাস করে শবর নিয়ে শূন্য-নারীকে ||

দেখি সে আমার তৃতীয় বাড়ী শূন্যের ন্যায় সমতুল্য |

সুন্দর এই সেই রে, কাপাস ফুটেছে ||

তৃতীয় বাড়ির পাশের জ্যোত্স্নাবাড়ী উদিত হল  |

অন্ধকার দূর হল রে, আকাশ ফুল্ল হল ||

কঙ্গুরিণা পাকল রে, শবর-শবরী মত্ত হল |

প্রতিদিন শবরের কিছুই চেতনা হয় না, মহাসুখে (সে) রইল ||

চতুর্থ সেই বাস তৈরী হল রে , চঞ্চালী দিয়ে |

তাতে তুলে শবরকে দাহ করল, কাঁদল শকুন শৃগালী ||

মারল ভবমত্তাকে রে, দশদিকে দিল বলী |

দেখ, সে সবরের নির্বাণ হল, ঘুচে গেল সব দুঃখ ||




চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপান্তর

গগনে তৃতীয় বাড়ি, হৃদয়ে কুঠার,

কণ্ঠলগ্না রমণীয়া নৈরামনি নারী–

শবর শূন্যতা-সঙ্গে সুখে আছে ভারি

ঝেড়ে ফেলে মায়া-মোহ-দ্বন্দ্ব-দুঃখ-ভার।

মহাশূন্যোপম অই বাড়িটির পাশে

ফুটেছে সুন্দর কত কার্পাসের ফুল,

এলিয়ে দিয়েছে চাঁদ জোছনার চুল,

আকাশকুসুম যেন ফুটেছে আকাশে।

খেতে খেতে পেকে ওঠে চিনা ও কাউন

শবরী শবর মাতে, ভুলে যায় সব;

চার-বাঁশের চেঁচাড়িতে শবরের শব

দাহ করা হয়–কাঁদে শিয়াল-শকুন।

দশ দিশে পিণ্ড পায় মৃত ভবমত্ত,

শবর নির্বাণ লভে, যায় শবরত্ব।





No comments:

Post a Comment